ব্রাজিল আমার প্রিয়, কিন্তু ফেবারিট নয়

ফুটবল নিয়ে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই আমি ব্রাজিল সমর্থক। সেটা কীভাবে? আমার বয়স তখন মাত্র ৬-৭ বছর। আমার বড় ভাইয়ের ১৪-১৫। তখন আমরা ডেনমার্কে থাকি। বড় ভাই ফুটবল খেলতেন। একবার তিনি একটা দলের সঙ্গে ইতালি গেলেন ম্যাচ খেলতে। ফেরার সময় ভাই আমার জন্য দুটি জার্সি নিয়ে এসেছিলেন। একটি ব্রাজিলের, অন্যটি ইন্টার মিলানের।

মজার ব্যাপার, দুটি জার্সির পেছনেই নাম লেখা ছিল ‘রোনালদো’। হ্যাঁ, আমি ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওর কথা বলছি। রোনালদো ইন্টার মিলানে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯৭ সালে। সম্ভবত ভাইয়া সেই বছরই ইতালি থেকে ওই জার্সি দুটি এনেছিলেন।

সেই থেকে আমি ব্রাজিলের ভক্ত। তবে ভালো লাগা থাকলেও এবারের বিশ্বকাপের ফেবারিটের তালিকায় আমি ব্রাজিলকে শীর্ষে রাখতে পারছি না। সোজা কথায়, ব্রাজিল আমার প্রিয়, কিন্তু ফেবারিট নয়।

এর পেছনে কারণও আছে। ব্রাজিল গত কয়েকটি বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নকআউট পর্বের চাপ তারা সামলাতে পারছে না। তা ছাড়া এবারের সেলেসাও দলে বিশ্বমানের বা ম্যাচ জেতানোর মতো ক্ষুরধার কোনো ‘নাম্বার নাইন’ আমি দেখছি না।

নেইমার বা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র থাকলেও প্রথাগত স্ট্রাইকারের এই অভাবটা বড় টুর্নামেন্টে ভুগিয়ে থাকে। এসব কারণেই আমি ব্রাজিলকে এবার ট্রফির দৌড়ে খুব একটা এগিয়ে রাখতে পারছি না। তাহলে ফেবারিট কে? ফুটবলীয় শক্তি ও সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় আমি স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং পর্তুগালের নাম বলব।

ব্রাজিল ফুটবল দল

এই বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের বাইরে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা, ভিসা নিয়ে জটিলতা—সব মিলিয়ে একটা অস্থিরতা।

শুনলাম সোমালিয়ার একজন রেফারি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেয়েও নাকি দেশটিতে ঢুকতে পারেননি। এগুলো নিয়ে নানা টেনশন তো আছেই। তবে আমার বিশ্বাস, খেলা মাঠে গড়ালেই এসব বিতর্ক পেছনের পাতায় চলে যাবে। মানুষ ফুটবলে ডুবে যাবে।

গত (২০২২) বিশ্বকাপ হয়েছিল কাতারে। দোহার সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। ফলে খেলা দেখতে বাংলাদেশের দর্শকদের তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি, সময়টা একদম পারফেক্ট ছিল। কিন্তু এবার খেলা হচ্ছে একদম ভিন্ন টাইম জোনে। শুধু দর্শকদের রাতের ঘুম হারাম হওয়া নয়, খেলোয়াড়দের জন্যও বিশাল দূরত্ব ভ্রমণ করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

আমরা যারা পেশাদার ফুটবলার, আমাদের কাছে বিশ্বকাপের এই সময়টা বিশেষ কিছু। বাংলাদেশে তো বিশ্বকাপ নিয়ে বরাবরের মতোই সাড়া পড়েছে। এবারও খবরে দেখলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়েছে! আবার এর উল্টো চিত্রও আছে। শুনলাম ঢাকার বনানীর এক ডাক্তার নাকি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য তাঁর ভিজিট ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়েছেন। ফুটবলের এই পাগলামি শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব।

সবশেষে বলব, এই বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের একটা যুগের অবসানের। বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি তারকার এটাই শেষ বিশ্বকাপ—মেসি, রোনালদো, মদরিচ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের জন্য এবং বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তদের জন্য একটা চরম আবেগময় পরিবেশ তৈরি হবে।

লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

যদি আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, এই বিশেষ বিশ্বকাপটা শেষ পর্যন্ত কার হতে পারে? আবেগের জায়গা থেকে আমি লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম দুটিই আগে বলব। আর বর্তমান ফর্মের বিচারে কিলিয়ান এমবাপ্পে তো আছেনই। দেখা যাক, শেষ হাসিটা কে হাসে!

জামাল ভূঁইয়া: জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক