
একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বিশ্বকাপ শিরোপা জেতা। এই ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে লিওনেল মেসির সাধনার কথা কারও অজানা নয়। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়াতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে কাতারে ২০২২ সালে স্বপ্ন পূরণ হয় মেসির। সেই একই শিরোপার সন্ধানে ৪১ পেরিয়েও বিশ্বকাপ খেলতে আরেকবার মাঠে নামতে প্রস্তুত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও। বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়া সব অর্জনের পরও যে বিশাল এক শূন্যতা থেকে যায়, সেটা ‘সিআর সেভেন’র চেয়ে ভালো কে আর জানেন!
কিন্তু সেই বিশ্বকাপ ট্রফিটিই ২০১৮ সালে হেসেখেলে রেকর্ড ভেঙেচুড়ে জিতেছিলেন ১৯ বছর বয়সী কিলিয়ান এমবাপ্পে। তখন ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই বলেছিলেন, ‘গ্রেট’ হওয়ার পথে সবচেয়ে কঠিন কাজটাই সবার আগে করে রাখলেন এমবাপ্পে। এখন সহজ কাজটা হয়ে গেলেই হয়। বিশ্বকাপের তুলনায় একটু হলেও সেই সহজ কাজটা ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়।
আধুনিক ফুটবলে অনেকের কাছে বিশ্বকাপের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাও সফলতার মানদণ্ড। এই শিরোপা রোনালদো ৫ বার এবং মেসি জিতেছেন ৩ বার। কিন্তু এমবাপ্পে এখনো চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি। শিরোপাটি তাঁর কাছে ধীরে ধীরে সোনার হরিণ হয়ে উঠছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সাল থেকে ৯ কোচের অধীনে ৩টি ক্লাবে ১০ বারের চেষ্টায় ৯৮ ম্যাচে ৭০ গোল করেও চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার দেখা পাননি এমবাপ্পে।
২০১৭ সালের গ্রীষ্মে রিয়ালকে একরকম পাশ কাটিয়েই এমবাপ্পেকে দলে ভিড়িয়েছিল পিএসজি। প্যারিসে সাতটি মৌসুম কাটিয়েছেন এমবাপ্পে, এই দীর্ঘ সময়ে খেলেছেন উনাই এমেরি, টমাস টুখেল, মরিসিও পচেত্তিনো, গালতিয়ের ও লুইস এনরিকের মতো পাঁচজন ভিন্ন কোচের অধীন। মোনাকোর জার্সিতে তাঁর চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক হয় কোচ লিওনার্দো জারদিমের অধীন।
পিএসজির হয়ে টানা ব্যর্থতার পর ক্লাব বদলে এমবাপ্পে যোগ দেন রিয়ালে। নিজের শহর, নিজের দেশ ছাড়ার পেছনে এমবাপ্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। এই লক্ষ্য পূরণে রিয়ালের চেয়ে সেরা মাধ্যম আর কী হতে পারে! রিয়ালের দখলে যে আছে ১৫টি শিরোপা। তার ওপর এমবাপ্পে আসার আগে শেষ ৮ মৌসুমে রিয়াল জিতেছিল ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। ফলে এমবাপ্পের ট্রফি ক্যাবিনেটে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক যোগ হওয়া সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু নিয়তির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন কিছু।
এমবাপ্পে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ইতিহাস গড়লেও রিয়াল পারছে না। রিয়ালের হয়ে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ মৌসুম পার করেও এমবাপ্পের অর্জনের খাতাটা শূন্য। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দলটি এমবাপ্পে যোগ দেওয়ার পর দুবারই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে। সব মিলিয়ে ৮ বছর আগে বিশ্বকাপ শেষে যে ট্রফিটা জেতা সহজ মনে হচ্ছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমবাপ্পের জন্য।
রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত তিনজন কোচের দিকনির্দেশনা পেয়েছেন এমবাপ্পে—কার্লো আনচেলত্তি, জাবি আলোনসো ও আলভারো আরবেলোয়া। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় আর লা লিগায় শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার পর এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে নিজের ১১তম চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযানে এমবাপ্পে একজন নতুন কোচ পেতে যাচ্ছেন। ২০২৬-২৭ মৌসুমের নতুন প্রজেক্টে আরবেলোয়ার দায়িত্বে না থাকা অনেকটাই নিশ্চিত।
এমবাপ্পে বারবার ব্যর্থ হয়ে এখন সেসব মহিরুহদের তালিকায় যোগ হওয়ার শঙ্কায়, যাঁরা ক্যারিয়ারে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি। রোনালদো (নাজারিও), জিয়ানলুইজি বুফন, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, রুদ ফন নিস্টলরয়, ফ্রান্সিসকো টট্টি, রোমারিও, লোথার ম্যাথাউস কিংবা পাভেল নেদভেদের মতো কিংবদন্তিরা এই শিরোপা জিততে পারেননি। ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পের ক্যারিয়ারে অবশ্য এখনো অনেক পথ বাকি, ফলে ভাগ্য বদলানোর সুযোগ তাঁর আছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে এমবাপ্পে দলের হয়ে সেরা সাফল্য পেয়েছেন সেই করোনা মহামারির মৌসুমে। ২০২০ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছিল পিএসজি। কিন্তু সেই ফাইনালে কিংসলে কোমানের করা গোলটি বায়ার্ন মিউনিখকে শিরোপা এনে দেওয়ার পাশাপাশি এমবাপ্পে-নেইমারদের স্বপ্নকেও চুরমার করে দেয়।
মোনাকোর হয়ে একবার এবং পিএসজির হয়ে তিনবার—মোট চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে উঠেছেন এমবাপ্পে। অথচ রিয়ালের হয়ে প্রথম দুই মৌসুমে ফরাসি তারকা সেমিফাইনালের দেখাও পাননি।
বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হেরে তিনি পিএসজি ছেড়েছিলেন। অথচ সেই ম্যাচটি জিতলেই লন্ডনের ফাইনালে তাঁর দেখা হতো রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গেই। বলা বাহুল্য, তা হয়নি। ফাইনালে ডর্টমুন্ডকে হারিয়ে শিরোপা জেতে রিয়াল। এরপর সেই রিয়ালেই যোগ দেন এমবাপ্পে। কিন্তু রিয়ালের চ্যাম্পিয়নস লিগ সৌভাগ্য যেন এমবাপ্পের দুর্ভাগ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
এত এত চেষ্টার পরও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারলেও এমবাপ্পে কিন্তু হাল ছাড়ছেন না। রিয়ালের হয়ে সামনের দিনগুলোতেও ইউরোপসেরা হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে চান এই তারকা।
গত পরশু রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্নের বিপক্ষে হারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এক বিবৃতিতে দেন এমবাপ্পে, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেওয়া হতাশাজনক। তবে আমাদের সামনে তাকাতে হবে। ভবিষ্যতে এমন হতাশা এড়াতে নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে আগে। আমরা কখনোই হাল ছাড়ব না। রিয়াল মাদ্রিদে ব্যর্থতা কখনোই বিকল্প ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। তবে আমি একটি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি—আমরা খুব শিগগির আবার জিততে শুরু করব।’