ম্যাচটা ততক্ষণে ইতিহাস হয়ে গেছে! আটলান্টা থেকে আকাশি-সাদার উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবলবিশ্বে। মাঠের বুকে কেউ হাসছেন, কেউ–বা আনন্দে আত্মহারা। ঠিক সেই মাতোয়ারা মুহূর্তেই গোলপোস্টের পাশে পড়ে থাকা একটুকরা কাপড়ের দিকে চোখ যায় জিওভানি লো সেলসোর।
আপন খেয়ালেই সেটি তুলে নেন তিনি। কাপড়ের ভাঁজ খুলতেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠে একযোগে। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’। সেলসোর সঙ্গে ব্যানারের অন্য পাশ ধরতে এগিয়ে আসেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। তাঁদের উদ্যাপনে একে একে শামিল আরও খেলোয়াড়।
মেসির দুই অ্যাসিস্ট, এনজোর দুর্দান্ত গোল কিংবা লাওতারোর সুপার হেড। আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল ম্যাচে এত এত গল্পের মাঝেও গত বুধবার একটি ব্যানারই হয়ে ওঠে অন্য এক চরিত্র। অথচ ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেও স্টেডিয়ামে এমন কোনো বিতর্কিত ব্যানার বা পতাকা নিয়ে ঢোকাই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল আয়োজকেরা। ফিফাও এখন এর পেছনে থাকা মানুষগুলোর শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল গলিয়েও কীভাবে মাঠের সবুজ ঘাসে পৌঁছাল এই ব্যানার? এর পেছনে আছে একদল আর্জেন্টাইন সমর্থকের অসম্ভব জেদ, ঝুঁকি আর কিছুটা ভাগ্যের হাত। একটা হোটেলের বিছানার চাদর কেটে, তাতে কালো রং দিয়ে তারা ফুটিয়ে তুলেছিল নিজেদের আবেগ।
স্টেডিয়ামের কড়া নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে যখন ভেতরে ঢুকল দলটি, তখন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। ঠিক তখনই এক নিরাপত্তাকর্মীর চোখে পড়ে যায়। পুলিশ ডাকার হুমকি আসতেই তারা ব্যানারটি মাঠে ছুড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
ব্যানারটি গিয়ে পড়ে পেনাল্টি বক্সের ঠিক কাছে। লো সেলসো যখন এটি তুলে নেন, তখনো তিনি জানতেন না এর ভেতরে কী লেখা আছে। কিন্তু লেখাটা দেখার পর দেশের প্রতি টান আর আবেগ আটকে রাখতে পারেননি। সতীর্থদের নিয়ে বুক ফুলিয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন ব্যানারটি।
উদ্যাপন শেষে গ্যালারির সমর্থকেরা এটি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনা দলের কর্মী পাত্রিসিও আউবার পরম যত্নে সেটি কুড়িয়ে নিয়ে যান ড্রেসিংরুমে। পরে নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে সেই ব্যানারের ছবি দিয়ে তিনি লেখেন, ‘যার জন্য প্রযোজ্য…এটি ভালো হাতেই আছে।’
আর্জেন্টাইন দৈনিক ‘লা নাসিওন’ জানিয়েছে, কাপড়ের সেই টুকরাটি এখনো আর্জেন্টিনা দলের কাছেই আছে। খুব সম্ভবত আগামী রোববার আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালে দলের সঙ্গেই আবার মাঠে যাবে এটি। এরপর হয়তো বিশ্বকাপের অন্যান্য স্মারক, জার্সি আর ট্রফির পাশে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মিউজিয়ামে ঠাঁই হবে।
একটি সাধারণ হোটেলের চাদর, একটি স্প্রে পেইন্টের ক্যান আর অসম্ভব এক পরিকল্পনা—বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে এক আবেগঘন ও চিরস্মরণীয় গল্প লেখার জন্য এইটুকুই তো যথেষ্ট।