আজতেকা স্টেডিয়াম
আজতেকা স্টেডিয়াম

আজতেকা: অমরত্বের ডাক শুনতে কি পাও

ফিফার দেওয়া নাম মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম, ফুটবল ইতিহাসে পরিচিত আজতেকা স্টেডিয়াম নামে। আজ বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে এ মাঠেই। তার আগে মেহেদী হাসান কান পেতে শুনেছেন আজতেকা স্টেডিয়ামের আনমনে বলে যাওয়া কিছু কথা, যেখানে আছে একটা হতাশাও—

মহাবিশ্বে প্রতিটি বস্তুর নাকি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে। আমার লক্ষ্যটা এত দিনে আমি বুঝে গেছি। সেই গল্প আর একটি ইচ্ছার কথা বলতে এসেছি তোমাদের কাছে।

মানুষ আমাকে বানিয়েছে নিজের লক্ষ্যপূরণে, সেটা করতে করতে আমি যেন এখন অক্ষয়, অমর, অজর। ঝড়ে, ভূমিকম্পে ধসে পড়তে পারি, কিন্তু আমার নাম-পরিচয় বিনে ফুটবলের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আমি এস্তাদিও বানোর্তে।

কুঁচকানো ভ্রু দেখে বেশ হাসি পাচ্ছে। এই নামে কাউকে মনে পড়ছে না? আমারও না, বুঝলে। আমার আদি নাম-পরিচয় বললে তো চিনেই ফেলবে, তাই নতুন নামটা বলে একটু মজা করলাম। বিশ্বকাপের জন্য আমাকে সাজানোর খরচ তুলতে, তোমরা আমার জন্মগত নাম-পরিচয় বেচে নতুন এই নামটা রেখেছ। নাহ, খারাপ লাগার সুযোগ নেই। আমাদের জাত-কুল জানে যে মানুষ প্রয়োজনে সব করতে পারে। এই যেমন ধরো, বিশ্বকাপে আবার অন্য নিয়ম; আমাকে এই নতুন নামে ডাকা যাবে না। ফিফার কড়া নির্দেশ; বলতে হবে, মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম।

ঢং দেখে আর বাঁচি না!

তবে আমার না নাম বদলানোয় কিছু যায় আসে না। ১৯৯৭ সালেও একবার এমন হয়েছিল। তাতে লোকের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। এখনকার মতো তখনো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ডেকেছে জন্মগত নামেই। আজতেকা! তোমাদের ফিফা সভাপতি বলেন, ফুটবল-ক্যাথেড্রাল। কিন্তু আসলেই কি তা–ই? মানুষকে যেহেতু পারি না, তাই নিজেকে এখন এই প্রশ্ন করি। লোকে বলে, আমার সবুজ বুকে যে নাকি সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি আঁকতে পারে, অমরত্ব তাঁর অবধারিত। তাহলে সেই মানুষই ফুটবলের এই ‘পবিত্র ভূমি’কে কীভাবে টাকার পাল্লায় তোলে?

মানুষ ভুলে যায়, আমার বুকটা তাদের অমরত্ব পাওয়ার ঠিকানা। শুধু মানুষ কেন, ম্যাচ, মুহূর্ত, দল, এমনকি উদ্‌যাপনও  আমার বুক থেকে সাঁই করে ঠাঁই পেয়েছে ইতিহাসের চিরসবুজ পাতায়। কেন? আমি জানি না, উত্তরটা তোমাদের কাছে।

শুধু জানি, কালে কালে বিভিন্ন গল্পে-ঘটনায় আমি হয়ে উঠেছি এক রহস্যঘেরা মিথ কিংবা সামান্য একটা স্টেডিয়াম নামের ‘কলোসাস অব সান্তা উরসুলা’। কালোমতো সেই ব্রাজিলিয়ান যেখানে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘আজতেকার কিছু একটা ব্যাপার আছে। খুব বিশেষ কিছু; ভেতরে পা রাখলে বোঝা যায়। অন্য কোথাও এমন লাগে না।’

আচ্ছা, অনুচ্চারিত এই ‘বিশেষ’ ব্যাপারটাই কি সেই অসীম ব্যাখ্যাতীত মহিমা, যার কোলে মানুষ উৎকর্ষের চরমে পৌঁছে গেলে জন্ম হয় নতুন ইতিহাসের?

নইলে ফুটবল–ইতিহাসে তর্ক সাপেক্ষে সেরা এবং প্রায় একই রকম দুটি ছবি আমার বুকে তোলা হবে কেন?

ম্যারাডোনার সেই অমর গোল

এক. সতীর্থের কাঁধে হাস্যেজ্জ্বল খালি গায়ের সেই কালো ব্রাজিলিয়ান। দুই. রোবের্তো চেজাস নামের এক সমর্থকের কাঁধে সাদা চামড়ার আর্জেন্টাইন, হাতে বিশ্বকাপ। ছবির মানুষ দুটি তোমাদের বড় আবেগের জায়গা, আপনার চেয়েও আপন মানুষ।

তবু বলি, প্রথম ছবিটি পেলের। পরেরটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার।

সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের তর্কটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল তাঁদের মধ্যে। এটা যদি অমরত্ব হয়, তবে তাঁদের সেই বর প্রাপ্তির পূণ্যভূমি ছিলাম আমি—এস্তাদিও আজতেকা। বড়াই নয়, এ আমার বড় গর্বের, বড় তৃপ্তির কথা। ’৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিলে আমার জন্মের লক্ষ্যপূরণ, ’৮৬–এর ম্যারাডোনায় পূর্ণতা।

লক্ষ্যপূরণের গল্পই আগে বলি। থোকা থোকা ইতিহাস-ঐতিহ্যগুলো জানলে বুঝবে, কালে কালে কেন আমি এখন ‘মিথিক্যাল টেম্পল’, যেখান থেকে বিশ্বকাপে অনেক কিছুর শুরু, যেখানে আলো ছড়ালেই মেলে অমরত্ব।

তারপর না হয় পূর্ণতা ও সেই ইচ্ছার কথা বলব।

ব্রাজিল ’৫০ বিশ্বকাপের জন্য মারাকানা বানিয়েছিল। গিলের্মো ক্যানেদো সেটাও ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ভদ্রলোক ১৯৬০ সালে মেক্সিকো ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হন। ১৯৯৭ সালে অল্প কিছুদিনের জন্য তাঁর নামেই আমার নাম পাল্টানো হয়। ক্যানেদোর বড় সাধ ছিল, সবাই মিলে ‘সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপটি আয়োজন’ হোক মেক্সিকোয়।

তৃতীয় শতকে জিতলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে বর্তমান সান্তা উরুসুলার বিশাল জায়গাজুড়ে পাথুরে লাভাভূমি তৈরি হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭২০০ ফুট ওপরে ওটাই আমার আর্বিভাবের জায়গা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে পৃথিবীর মঞ্চ।

আজতেকা স্টেডিয়াম। যখন বানানো হচ্ছিল, সে সময়ের ছবি

১৯৬১ সালে সেটা বানানো এত সহজ ছিল না। এক বছর সময় নিয়ে ৬৪ হাজার বর্গমিটার জায়গা থেকে শুধু ১৮ কোটি কেজি পাথরই সরাতে হয় ৮০০ শ্রমিক, ৩৫ প্রকৌশলী ও ১০ স্থাপত্যবিদের সহায়তায়। তারপর শুরু হয় গড়ার কাজ। জায়গাটা কয়োকান অঞ্চল, মেক্সিকানদের পূর্বপুরুষ আজতেক সভ্যতার প্রত্নতত্ত্বও পাওয়া গিয়েছে আমাকে তৈরির সময়।

সেই ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে ’৭০ বিশ্বকাপ যখন শুরু হলো, তখনো আমি ইতিহাসের অংশ। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ। আর মাঠে জন্ম হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা সব গল্পের। শতাব্দীর সেরা ম্যাচ, সব রাউন্ডেই জর্জিনিওর গোল, কার্লোস আলবার্তোর অনিন্দ্যসুন্দর গোল…। সব ছাপিয়ে গিয়েছিল ‘বিউটিফুল টিম’ ব্রাজিল। পেলে তার শীর্ষবিন্দু।

ফাইনালে আলবার্তোর সেই গোলের আগে আটজন মিলে ‘নাইন পাস’ ফুটবলের শেষ পাসটি ছিল পেলের, পায়ের আলতো টোকায় যেন পাতে তুলে দেওয়া রসগোল্লা। জানো, এসব, সব কিছুই আমার বুকে। আমার বুকেই ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ খেলে তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতে পেলের অমরত্ব প্রাপ্তি। ফাইনালে খেলা ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেলো ডোমেনগিনির ভাষায়, ‘আ থিং অব বিউটি’। সঙ্গে অমর কবি জন কিটসের বাকিটা জুড়লেই ফুটে ওঠে ’৭০ বিশ্বকাপের রূপ, ‘আ জয় ফরএভার।’

তবু আজ এত বছর পর মনে হয়, আমি আসলে মানুষের প্রয়োজনে ভাগ্যের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথের ভারে ন্যুব্জ এক ‘থিয়েটার অব ইমর্টালিটি’। কারণ, কিছু বানাতে ৯ কোটি ৫০ লাখ পেসোর বাজেট ২০ কোটি পেরিয়ে গেলে সেটা হয়ে ওঠে মানুষের বড় সাধ ও স্বপ্নপূরণের জায়গা। ফাইনালের সেরা ভেন্যু হিসেবে তাই আমার বিকল্প ছিল না।

যেমনটা ছিল না, ’৮৬ বিশ্বকাপ আয়োজনে কলম্বিয়ার অপারগতা প্রকাশের পর। ফিফাকে ফিরতে হয় মেক্সিকোয় মানে, আমার কোলে। ম্যারাডোনা সেই কোলেই কোয়ার্টার ফাইনালে ১১ সেকেন্ডের এমন এক দৌড় দিল, পেছনে ইংল্যান্ডের নয়জন, সামনে ‘শতাব্দীর সেরা গোল।’

চার মিনিট পর আরও একটি; এবার ‘হ্যান্ড অব গড’—যেন অনিন্দ্যসুন্দর ও নিষিদ্ধ ‘গন্ধম’ পাশাপাশি। দুটিই আজ ইতিহাসের অংশ। যেমনটা মেক্সিকান ওয়েভের বৈশ্বিক পরিচিতি, নেগ্রেতোর সিজর্স কিকের গোলে ফুটবল ইতিহাসে ‘কানে তালা লেগে যাওয়া মুহূর্ত’—সবই সেবার অমরত্ব পেয়েছে এই বুকে। কিন্তু ম্যারাডোনার মতো কেউ আদায় করে নিতে পারেনি।

আজতেকায় পেলের অমরত্ব পাওয়ার সেই মুহূর্ত। ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক ছবি

’৭০ পূর্ণ বিকশিত পেলের প্রাপ্য ছিল। জর্জিনিও, তোস্তাও, রিভেলিনো, গারসনদের সেই ব্রাজিল ছিল তারকাখচিত। ’৮৬–এর আর্জেন্টিনা তেমন ছিল না। সাদামাটা একটি দল নিয়ে মানুষের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে ম্যারাডোনা সেবার হয়ে উঠেছিলেন ‘এল পিবে’ (সোনার ছেলে)।  কান পাতলে এখনো শুনি, ধারাভাষ্যকার ভিক্টর মোরালেসের কণ্ঠে আবেগের খনি, ‘দ্য গ্রেটেস্ট সলো গোল অব অলটাইম। কসমিক কাইট, হুইচ প্লানেট ডিড ইউ কাম ফ্রম?’

২৯ জুন ১৯৮৬। ম্যারাডোনার অমরত্ব আদায়ের সেই ম্যাচটাই আমার বুকে শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এবার আবারও ডাক পড়েছে নতুন কোনো গল্প, রূপকথার জন্ম দিতে। কিন্তু আমার মনে বেজায় দুঃখ। আমার ইচ্ছাটা হয়তো পূরণ হবে না!

বড় সাধ ছিল, লিওনেল মেসির অমরত্ব পূর্ণতা পাক আমার বুকে।

হেসো না প্লিজ। ভাবছ, সেটা তো ২০২২ সালেই নিশ্চিত হয়েছে, নতুন করে দেওয়ার কী আছে! আচ্ছা, কাতারে কয়টি স্টেডিয়াম ছিল যেটা ইতিহাস-ঐতিহ্যে আমার সমান? বড়াই নয়, এটা বাস্তবতা। অমরত্বের নীলপদ্মটি হয়তো তাঁর আছে, কিন্তু সেটার যোগ্য মঞ্চ কি ছিল? এবারও কি আছে? তিনটি দেশের ভেন্যু মিলিয়ে ধারেভারে শুধু আমি ছিলাম, কিন্তু আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো অন্য ভেন্যুতে। শেষ ৩২ ও শেষ ষোলোতে পাব না জানি না। কেউ ভাবেনি, আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচ আমার বুকে রাখলে কী হতো! পেলে, ম্যারাডোনা তারপর মেসি; ধাঁধাটা মিলে যেত কী!

আমি এভাবেই দেখি। ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজিত হবে আমার বুকে। পেলেকে দিলাম, ম্যারাডোনা ছিনিয়ে নিল, আর এখন মেসিকে পাব না! আচ্ছা, তর্পণ কী হয় শুধু বুকেই, দূর থেকে মনে মনেও তো হয় নাকি! তাঁকে না পেলেও অন্তত এটা তো জানি, কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপে আমিও ছিলাম। আর এই পক্ষপাতের কারণ তো বোঝোই। আমার লাতিনপ্রীতি বেশি এবং বিশ্বকাপজয়ীদের ব্যাপারটা সত্যিই আলাদা।

আজতেকার বুকে ম্যারাডোনার সেই ছবিটি। ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনার অমরত্ব পাওয়ার মুহূর্ত

যেমন আমি। আমাকে ছাড়া তোমাদের এই খেলাটা অসম্পূর্ণ। তোমাদের এই খেলার ইতিহাসে সেরা দুজন সর্বকালের সেরা হয়েছেন আমার বুকে। মেসি তাঁদের সমান কিংবা তাঁদের চেয়েও ভালো, তাই তাঁকে যেচেছি প্রাণপণে। লোকে বলে, আজতেকা নাকি জীবন্ত! আমাকে বানানোর সময় নাকি এখানে নরমুন্ডু দেওয়া হয়েছে, যেন স্থাপত্য আরও শক্ত ভিত পায়। এসব গালগল্প তোমাদের দেশেও আছে জানি। তবে লোকে ভূত দেখে আমার বুকে। স্টেডিয়ামের ভেতরে সেই ভক্তের ভাস্কর্যের মুখ নাকি গভীর রাতে ঘুরে যায়। পায়ের আওয়াজ মেলে গ্যালারি থেকে পড়ে মরে যাওয়া এক শিশুর।

এই যে এত সব মিথ, এত ইতিহাস, এত ঐতিহ্য—সব কিছুই মানুষের তৈরি। ভাবলে ভীষণ দুঃখ হয় যে মানুষের এত সব কীর্তি বয়ে চলা আমি সেই নিশ্চল জড়, যে খুব করে এই খেলার শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে চাইলেও কেউ শুনবে না।

কারণ, আমি মানুষ নই। আমি আজতেকা স্টেডিয়াম।