ব্রাজিলের অনুশীলনে ভিনিসিয়ুস ও কাসেমিরো
ব্রাজিলের অনুশীলনে ভিনিসিয়ুস ও কাসেমিরো

ব্রাজিলের সামনে আটলাসের সিংহরা

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগের রাতগুলো নিয়ে একটা পুরোনো কথা আছে। বলা হয়, সেলেসাওর ড্রেসিংরুমে তখন যত চাপ থাকে, ব্রাজিলের কোনো রাষ্ট্রপতি বোধ হয় তার অর্ধেকও সহ্য করেন না। গোলকিপার আলিসনের কথাগুলো তাই স্রেফ রসিকতা মনে করবেন না, এগুলো অনেকটাই বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে নিয়ে বলতে গিয়ে ব্রাজিলের এই গোলকিপার বলেছেন, ‘তাঁর পদে চাপ হয়তো দেশের প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি।’

আজ সেই চাপের প্রথম পরীক্ষাটা মরক্কোর বিপক্ষে। পরীক্ষা? বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোথায় ব্রাজিল, আর কোথায় মরক্কো! দুই দলের এর আগে একবারই দেখা হয়েছে বিশ্বকাপে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে রোনালদো-রিভালদো-বেবেতোর তোপে মরক্কো উড়ে গিয়েছিল ৩-০ গোলে। এমনকি চার বছর আগে হলেও এই ম্যাচটাকে ব্রাজিলের জন্য পরীক্ষা বলা হচ্ছে শুনে বক্তার ফুটবল–জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত।

কিন্তু যাঁরা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ দেখেছেন, তাঁরা জানেন মরক্কো এখন বিশ্বকাপে একটা বিপ্লবের নাম। স্পেনকে হারিয়েছিল তারা। পর্তুগালকে বিদায় করেছিল। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে থামতে হয়েছিল, কিন্তু দুনিয়াকে চমকে দিতে দিতে। মাঠের নয়, পুরো টুর্নামেন্টের গল্পটাই পাল্টে দিয়েছিল আটলাসের সিংহরা। এবার তাই আসলে ব্রাজিলের পরীক্ষাই।

অবশ্য শুধু পরীক্ষাও নয়, একটা বার্তা পাঠানোর সুযোগও। হেক্সার জন্য ২৪ বছরের অপেক্ষা, এই বিশ্বকাপ বাছাইয়ে টলমল পায়ে টিকে থাকা, তিন বছরে চারজন কোচ বদলের পর ব্রাজিল উত্তর আমেরিকার টিকিট কেটেছে প্রায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে। আর্লিং হলান্ডের মতো নিখুঁত গোলশিকারি না থাকলেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগের যে চনমনে ধার থাকে, সেখানে এবার বড় ধাক্কা। রদ্রিগো নেই, এস্তেভাও নেই, এদের মিলিতাও নেই, ওয়েসলি নেই। আর নেইমার? কাফের চোটে তিনি এই ম্যাচে মাঠে নামছেন না। কখন ফিরবেন, কতটুকু পারবেন—সেটা এখনো ধোঁয়াশা।

নইলে বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের প্রেডিকশন করতে গিয়ে ব্রাজিলের নামটা এক নম্বরে লিখে তারপর বাকিদের কথা বলাটাই তো একসময় অলিখিত নিয়ম ছিল। মিলেনিয়ালের পরের প্রজন্মগুলোর কাছে কথাটা শুনে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে।

অনুশীলনে মরক্কো দল

সেটা আবার মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আনচেলত্তির কাঁধে। লোকটা ক্লাব ফুটবলে ডাগআউটের রাজা। ইউরোপের মুকুটে তাঁর নাম লেখা বহুবার। কিন্তু জাতীয় দলের বিশ্বকাপ? একেবারে নতুন অধ্যায়। রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এসেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জটা নিতে। ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি কোচ হয়ে এরই মধ্যে ইতিহাস গড়েছেন। এখন আরেকটা ইতিহাস গড়ার সুযোগ।

আলিসন বলেছেন, আনচেলত্তির আগমনের পর পরিবেশটাই বদলে গেছে। ‘বিতর্কমুক্ত, কাজের পরিবেশ এসেছে’—কে জানে আলিসন এটাই বোঝাতে চেয়েছেন কি না যে এই শান্তি বহুদিন ছিল না সেলেসাওর ক্যাম্পে!

মরক্কো শিবিরেও অবশ্য শান্তি নেই। বিশ্বকাপের তিন মাস আগে দীর্ঘদিনের কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই হঠাৎ পদত্যাগ করেছেন। নতুন কোচ মোহামেদ উহবি। যুব পর্যায় থেকে উঠে আসা, গত বছর চিলিতে মরক্কোকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন, হারিয়েছেন আর্জেন্টিনার এক দুর্দান্ত দলকে। বয়স মাত্র ৪৯।

দায়িত্ব নিয়েই দলটাকে আবার চনমনে করে তুলেছেন উহবি। এই বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচটা সামনে রেখে বলেছেন, ‘ব্রাজিলের ইতিহাসকে সম্মান জানাই। কিন্তু নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। জয়ের মানসিকতা নিয়েই আমরা মাঠে নামব।’

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি

এই আত্মবিশ্বাস হাওয়ায় আসে না। স্পেন ও ফ্রান্সের একাডেমিতে গড়ে ওঠা এক প্রজন্ম এখন মরক্কো দলের মেরুদণ্ড।

চোটের সঙ্গে একটা প্রচ্ছন্ন লড়াই চলছে দুই দলেরই। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ প্রীতি ম্যাচে চোট পেয়ে মরক্কো দল থেকে ছিটকে গেছেন নায়েফ আগের্দ এবং আবদে ইজ্জালজৌলি। ব্রাজিলের অনেকে তো বিশ্বকাপেই আসতে পারেননি। ফলে মার্কিনিওস এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালেস সেন্ট্রাল ডিফেন্সে থাকলেও রাইটব্যাক পজিশন নিয়ে আনচেলত্তিকে জুয়া খেলতে হচ্ছে। দানিলো, ইবানেজ নাকি মিডফিল্ডার এদেরসন—কে সামলাবেন সেই ফাঁক?

এই ভারসাম্যহীনতার মধ্যে ব্রাজিলের যা অবশিষ্ট শক্তি, তার কেন্দ্রে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আনচেলত্তি নিজেই তাঁকে রিয়ালে গড়েছেন, বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড বানিয়েছেন। তাঁর সেই ক্লাব-ম্যাজিক আন্তর্জাতিক মঞ্চেও কাজ করে কি না, এই বিশ্বকাপেই জানা যাবে।

পঞ্চমবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই ২০০২ সালে। তার পর থেকে ষষ্ঠ শিরোপাটা যেন দিগন্তে আলোর মতো—দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
হেক্সার মিশনের শুরুতেই মরক্কোর দেয়াল টপকাতে না পারলে সেই আলো আরও দূরে সরে যাবে।