ম্যারাডোনার সেই ছবি
ম্যারাডোনার সেই ছবি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ম্যারাডোনা, প্রকাশ পেল ৩৭ বছর আগের ছবি

ফুটবলার হতে ছুটতে হয় বলের পিছু। তারপর একদিন ফুটবলার হয়ে ওঠার পর? তখন তো আরও বেশি জোরে দৌড়াতে হয়। তবে পৃথিবীতে এমন কেউ কেউ এসেছেন, বলই যাঁদের পিছু ছুটেছে সব সময়। অন্য চোখে আমরা তাঁদের বলি কিংবদন্তি। যেমন ডিয়েগো ম্যারাডোনা!

বলের পিছু ছোটার বিষয়টি এমন, যেখানেই যান না কেন তাঁকে ঘিরে ফুটবল কিংবা ফুটবলের গল্পসল্পই উঠে এসেছে সবার আগে। জলে ও স্থলে কিংবা এখন যেমন অন্তরিক্ষে—২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ম্যারাডোনা প্রয়াত হয়ে ওই দূর আকাশে সত্যিকারের তারকা হয়ে ওঠার পর তাঁকে নিয়ে গল্পে, আড্ডায়, স্মৃতিচারণায় তো ফুটবলই উঠে আসে সবার আগে।

দুই দিন আগে ফার্নান্দো সিনিওরিনিও ইনস্টাগ্রাম পোস্টটি যেমন। ৭৬ বছর বয়সী এ ভদ্রলোক দীর্ঘদিন ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত ট্রেনার ছিলেন। সেটা কিংবদন্তির সোনালি দিনগুলোয়—১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪। তখন চোখের সামনে দেখেছেন ম্যারাডোনা যেখানেই গেছেন, ফুটবলও তাঁর পিছু ছুটেছে। সেটা হোক স্কুল–কলেজ থেকে গির্জা কিংবা যুদ্ধজাহাজ।

সিনিওরিনি এর প্রমাণ হিসেবে তাঁর সেই পোস্টে কয়েকটি ছবিও পোস্ট করেন। সেটা ৩৭ বছর আগের ছবি। একটি যুদ্ধজাহাজে গুলি ছোড়ার বিশাল দুটি নলের মাঝে দাঁড়িয়ে বল পায়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা। ক্যাপশনে সেই চিরন্তন সত্যই লেখা, ‘সব জায়গাতেই ম্যারাডোনার সঙ্গে বল থাকতই। ১৫ নভেম্বর, ১৯৮৯।’

সালটা যেদিন এই ছবি তোলা সেদিনের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যারাডোনার এই ছবিগুলো আলোড়ন তোলার একটি কারণও আছে। সাধারণত ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের বারবার দেখা ছবি কিংবা ভিডিওগুলোই ঘুরেফিরে সামনে আসে। কিন্তু এই ছবিগুলো তেমন নয়। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘ক্লারিন’ জানিয়েছে, এই ছবিগুলো এত দিন অপ্রকাশিত ছিল।

যুদ্ধজাহাজে গুলি ছোড়ার বিশাল দুটি নলের মাঝে দাঁড়িয়ে বল পায়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা

সিনিওরিনি যেহেতু বহুদিন ম্যারাডোনার সঙ্গে ছিলেন, তাঁর মাঠ ও ব্যক্তিগত জীবনকে খোলনলচে জেনেছেন, চোখের সামনে অনেক কিছুর সাক্ষী ছিলেন, তাই ’৮৬ বিশ্বকাপ কিংবদন্তিকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণায় নতুন কিছু উঠে আসা স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যমটির ভাষায়, সিনিওরিনি ম্যারাডোনাকে স্মৃতির ঝাঁপি খুললে প্রতিবারই প্রকাশ পায় কিংবদন্তির জীবনঘনিষ্ঠ না বলা সব গল্প।

কারণটা হয়তো আরেকটু গভীরে। সিনিওরিনি ম্যারাডোনাকে জানতেন, বুঝতেন। সে জন্যই একবার বলেছিলেন, ‘আমি ডিয়েগোর পেছনে পৃথিবীর শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে রাজি আছি, কিন্তু ম্যারাডোনার সঙ্গে রাস্তার মোড় পর্যন্তও যাব না।’ এ কথার ভেতরে তাকালে বোঝা যায়, সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ফুটবলারের ভেতরে সিনিওরিনি আবিষ্কার করেছিলেন দুটি সত্তা; ডিয়েগো—নিখাদ মানুষ, সরল ও বন্ধুবৎসল, মাঠে ফুটবল জাদুকর কিন্তু ভেতরে শিশুর মতো মন। ম্যারাডোনা—প্রচারমাধ্যম, ভক্তদের অতিরিক্ত উন্মাদনা এবং খ্যাতির চরম চাপ থেকে তৈরি হওয়া এক ধ্বংসাত্মক চরিত্র, যা তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করেছিল।  

সে অন্য এক গল্প। সিনিওরিনির পোস্টে ফেরা যাক।

ইউএসএস আইওয়ার নাম শুনেছেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ রণতরি বেশ আগে থেকেই অবসরে। ১৯৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রথম যে ছয়টি রণতরি বানায়, সেগুলোর মধ্যে ‘লিড শিপ’ ছিল এই আইওয়া। ওই ছয়টি রণতরিকে আইওয়ার নামেই ডাকা হয় ‘আইওয়া ক্লাস।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচল করা এ শ্রেণির একমাত্র রণতরি ছিল ‘ইউএসএস আইওয়া’। ইতিহাস–শিক্ষা বাদ দিয়ে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ১৯৮৯ সালের সেই নভেম্বরে ইতালির নেপলসে অবস্থান করছিল আইওয়া। ম্যারাডোনা তখন নাপোলিতে ‘মহানায়ক’। অনেকটাই ‘ঘর হতে দু পা ফেলিয়া’ কোনো কিছু দেখতে যাওয়ার মতো আইওয়া পরিদর্শনে গিয়েছিলেন কিংবদন্তি। তারই ছবিগুলো পোস্ট করে সেসব দিনের স্মৃতিচারণা করেন সিনিওরিনি।

ম্যারাডোনার সঙ্গে সিনিওরিনিও

সেই পরিদর্শনের পটভূমিও সিনিওরিনি জানিয়েছেন তাঁর পোস্টের ক্যাপশনে, ‘নেপলসে ন্যাটোর সদর দপ্তর থেকে ম্যারাডোনাকে ‘ইউএসএস আইওয়া’ রণতরি পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম আমিও।’

ম্যারাডোনা তত দিনে ’৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছেন। নাপোলিকে জিতিয়েছেন লিগ ও উয়েফা কাপ। পাশাপাশি মাঠে ব্যক্তিগত ঝলকের পসরা তো ছিলই। আসলে মহাতারকা বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। তা, এই মহাতারকাকে আইওয়ায় কেমন মর্যাদায় বরণ করে নেওয়া হয়েছিল, সেটাও জেনে নিতে পারেন সিনিওরিনির পোস্টে, ‘সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তিনি। আমাদের সময়টা দারুণ কাটছিল।’

কিন্তু ওই যে কথায় আছে না, বিধির লিখন না যায় খণ্ডন! ম্যারাডোনাও খণ্ডাতে পারেননি। বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে সাক্ষাতে গেলেও তাঁকে সেখানে বল নিয়ে কায়দা–কসরত করে দেখাতে হয়েছে। ইউএসএস আইওয়ায় ব্যাপারটা তাই অবধারিতই ছিল।

কারণ, সেই সময়ে ফুটবলকে বশ বানানোর মুনশিয়ানায় সম্ভবত ম্যারাডোনার চেয়ে ভালো কেউ ছিলেন না। নেপলসবাসী তা প্রতিদিনই দেখতেন। আর্জেন্টাইনরা তো তা দেখে আসছিলেন ম্যারাডোনার শৈশব থেকেই। আর বেসবল–পাগল যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ থেকে গোটা বিশ্ব হয়তো সেটাই ভালোভাবে দেখেছেন ’৮৬ বিশ্বকাপে। ফুটবলটা যে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই পছন্দ করতেন, সেটার প্রমাণ হলো ম্যারাডোনা আইওয়ায় ওঠার পর কোত্থেকে যেন তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি ফুটবল।ওই তো, বল নিয়ে কিংবদন্তির অবিশ্বাস্য সব কারিকুরি দেখার আবদার!

সিনিওরিনির পোস্টের ভাষায়, ‘হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা বল চলে এল। বল পাওয়ামাত্রই একদম ছোটবেলার মতো নাচাতে (জাগলিং) শুরু করে দিলেন ম্যারাডোনা—যেটি আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের ম্যাচে মধ্যবিরতিতে তিনি নিয়মিত করতেন। কিছু ভাবার সময়ই পাননি!’ হয়তো জানেন কিংবা না–ও জানতে পারেন, ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সে থাকতে ম্যাচের বিরতিতে বল নিয়ে বিভিন্ন কারিকুরি দেখিয়ে দর্শককে আনন্দ দিতেন।

আইওয়ার ডেকেও সবাইকে ম্যারাডোনা আনন্দ দেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলো রসি। তৎকালীন নেপলস ও দক্ষিণ ইতালির শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ইল মাতিনোতে কাজ করতেন। ম্যারাডোনার আইওয়া পরিদর্শন নিয়ে পরে প্রতিবেদনও করেছিলেন রসি।

ইনস্টাগ্রামে ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটি ভাবনা মনে আসতে পারে। ফুটবলে সব কিংবদন্তির পরিচয় বুঝি একটাই—বলের সঙ্গে সখ্য কত ভালো! নইলে রণতরি দেখতে গিয়েও ম্যারাডোনাকে কেন বল নিয়ে ‘জাগলিং’ প্রদর্শন করতে হবে? কেন প্রতিবারই এমন সব মুহূর্তে শিশুর মতো আনন্দ নিয়ে বলকে পোষ মানাতে দেখা যেত ম্যারাডোনাকে! কারণ সম্ভবত একটাই—পৃথিবীতে ম্যারাডোনার সঙ্গে শুধু একটি বস্তুর সম্পর্কেই কখনো চোট লাগেনি। ফুটবল!