
হলুদ আর আকাশি-নীল।
এই দুটি রঙের সঙ্গে বাঙালি জীবনের এক অদ্ভুত, অমীমাংসিত মনস্তাত্ত্বিক লেনদেন। শৈশবের কোনো এক সন্ধ্যায় পুরোনো টেলিভিশনের সামনে বসে কিংবা মাঝরাতে চোখ কচলাতে কচলাতে খেলা দেখতে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে ফুটবল-নায়কের প্রেমে পড়া, সেই প্রেম আজীবন এক অলিখিত দাসত্বে রূপ নেয়।
এই প্রেম কোনো যুক্তি মানে না, কোনো পরিসংখ্যানের তোয়াক্কা করে না। আর তাই তো ২৪ বছর ট্রফি না পেয়েও একটা ছেলে বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের পাঁচ তারকার জার্সিতে ইস্তিরি করে কিংবা ৩৯ বছরের এক ‘বুড়ো জাদুকরে’র পায়ের পেশির টানে অনেক তরুণের রাতের ঘুম উড়ে যায়। উত্তর আমেরিকার তিন দেশে যখন আরেকটি ফুটবল মহোৎসবের দামামা বাজছে, তখন বুয়েনস এইরেস থেকে রিও ডি জেনিরো হয়ে ঢাকার অলিগলি—সব রুটের ট্রেন এসে থামছে এক অনন্ত সংশয় আর সম্ভাবনার স্টেশনে।
চলুন, প্রথমে আলাবামার অবার্নের সেই দৃশ্যপটে ফেরা যাক।
আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের তখন ৭০ মিনিট। মাঠের এক পাশে চতুর্থ অফিশিয়াল ডিজিটাল বোর্ডটা তুললেন, গ্যালারিতে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন কোনো উপাসনালয়ে স্তবগান শুরুর আগের মুহূর্ত। সবুজ ঘাসে পা রাখলেন লিওনেল মেসি। পেনাল্টি স্পট থেকে যখন বলটা জালের এক কোণে আশ্রয় নিল, ধারাভাষ্যকারের চিৎকারের আড়ালে যেন কোটি কোটি মানুষের এক দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস। ক্লাব আর দেশ মিলিয়ে ৯১১তম গোল।এই গোলটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি আসলে এক মহাজাগতিক আশ্বাসের নাম।
অথচ এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ফিলাডেলফিয়ার বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির ম্যাচে যখন মেসি তাঁর বাঁ হ্যামস্ট্রিং চেপে ধরে টানেলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন পুরো আর্জেন্টিনার বুকে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, কাতার সংস্করণের সেই রূপকথা কি তবে এবার এক ট্র্যাজিক অপেরা দিয়ে শেষ হবে?
স্কালোনি অবশ্য দ্রুতই আশ্বস্ত করেছেন, মাংসপেশি ছেঁড়েনি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ২০ মিনিট আসলে এক মহড়া—মেসি প্রস্তুত।
তবে এই আর্জেন্টিনা দলটা এখন আর কেবল মেসির কাঁধে চড়া কোনো দল নয়, এটি এক ইস্পাতকঠিন পরিবার। কাতারজয়ী ১৭ জন যোদ্ধা এবারও আছেন। মাঝমাঠের সেই চতুর চতুষ্টয়—ম্যাক অ্যালিস্টার, দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও পারেদেস আছেন পাহারায়। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজের আঙুলের ফ্র্যাকচারও ১৬ জুনের আগে শুকিয়ে যাওয়ার কথা। আক্রমণভাগে সিরি’আর শীর্ষ গোলদাতা লাওতারো মার্তিনেজ আছেন খুনে ফর্মে। মেসি ছাড়াও যে দল জিততে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে হন্ডুরাসের বিপক্ষে লাওতারো ও জুলিয়ানো সিমেওনের গোলে।
তবু, ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের যে হাতছানি আর্জেন্টিনার সামনে, তার জন্য শুধু প্রতিভা নয়, লাগবে অলৌকিক কিছুর ছোঁয়া।
এবার একটু চোখ ফেরানো যাক সান্তোসের সেই বিষাদমাখা রাজপুত্রের দিকে।
ফুটবল ইতিহাসে নেইমার জুনিয়র নামটা সম্ভবত এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের সমার্থক। ২০১৫ থেকে ২০২৫—মাত্র ১০ বছরে ৩৩ বার ইনজুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক শরীর। বিশ্বকাপের ঠিক আগে সান্তোসের হয়ে খেলতে গিয়ে কাফ মাসলের গ্রেড-টু চোট নিয়ে যখন তিনি মাঠ ছাড়লেন, মনে হলো ভাগ্যের দেবী তাঁর দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হাসছেন।
তবে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সর্বশেষ এমআরআই রিপোর্ট বলছে, ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে তিনি মাঠে নামতেও পারেন। রদ্রিগো যখন এসিএল ইনজুরিতে ছিটকে গেছেন, তখন এই ভাঙাচোরা নেইমারই হয়তো ব্রাজিলের শেষ খড়কুটো।
ব্রাজিলের ২৪ বছরের ট্রফি-খরা এখন এক জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। ২০০২-এর সেই জাপানের রাতের পর থেকে কেবলই অন্ধকার। এবার ডাগআউটে বসেছেন এক চতুর ইতালিয়ান জাদুকর—কার্লো আনচেলত্তি। ইউরোপ জয় করা এই ভুরু নাচানেওয়ালা কোচের ওপরই সেলেসাওদের ষষ্ঠ নক্ষত্র ছোঁয়ার ভার। প্রীতি ম্যাচে পানামাকে ৬-২ আর মিসরকে ২-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল একটা ঝলক দেখিয়েছে বটে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারেস আর তরুণ এন্দ্রিকরা গোল পাচ্ছেন। কিন্তু মিসরের বিপক্ষে মার্কিনিওসের সেই আলগা ব্যাকপাস যেন মনে করিয়ে দিল—ব্রাজিলের আসল শত্রু তাদের নিজেদের রক্ষণের অমনোযোগিতা।
সবচেয়ে বড় ধাঁধা অবশ্য ভিনিসিয়ুস নিজে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে যিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছারখার করে দেন, ব্রাজিলের জার্সিতে এলেই তাঁর পা যেন কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। ৪৯ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাত্র ৯ গোল—এই পরিসংখ্যান কোনো গ্যালাকটিকোকে মানায় না। আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ভিনিসিয়ুসের সেই মাদ্রিদ-অবতারকে ব্রাজিলের হলুদে রূপান্তর করা।
গ্রুপ পর্বের সমীকরণ বলছে, সি গ্রুপে ব্রাজিল লড়বে মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। আর জে গ্রুপে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। কাগজ-কলমে দুই পরাশক্তিই নিজ নিজ গ্রুপে পরিষ্কার ফেবারিট।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরন্তন প্রশ্ন—কখন হবে সেই ‘সুপার ক্লাসিকো’? সমীকরণ খুব সহজ। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল যদি নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে এগোয়, তবে সেমিফাইনালের আগে তাদের দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ মহাকাব্যিক সেই লড়াই দেখতে হলে ফুটবল–বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত শেষ চার পর্যন্ত।
তারপর? কে জানে, হয়তো কোনো এক জুলাইয়ের রাতে নিউ জার্সির আকাশে যখন আতশবাজি ফুটবে, তখন মারাকানার কোনো এক বুড়ো কেঁদে উঠবেন আনন্দে! অথবা বুয়েনস এইরেসের কোনো এক দেয়ালে মেসির ছবির পাশে লেখা হবে—‘ধন্যবাদ, হে ঈশ্বর!’
মাঠই হোক সেই শেষ ফয়সালার আদালত।