আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ফুটবলে মুখোমুখি হলেই চলে আসে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ম্যাচের পর থেকে তা আরও বেশি। ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—চার মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের রং বদলে দিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
বহু বছর পর নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ম্যাচটা তাঁদের জন্য ছিল চার বছর আগের ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ। এখন যখন আবার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হচ্ছে, এবারও ঘুরেফিরে বারবার আসছে সেই ফকল্যান্ড।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো তো আর্জেন্টাইন দৈনিক ‘লা নাসিওন’ পত্রিকায় এ নিয়ে দীর্ঘ একটা প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন। সেখানে তিনি ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের ‘কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপনকারী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ভূখণ্ডটি হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে ব্রিটেনের প্রতি দাবি জানান কির্নো।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে, অন্যদিকে ব্রিটেন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। ঐতিহাসিক সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা দাবি করে এ দ্বীপপুঞ্জটি তাদের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ব্রিটেন ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে শাসন করে এসেছে। দ্বীপের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।
এ নিয়ে ১৯৮২ সালে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে জড়ায় দুই দেশ। ৭৪ দিন স্থায়ী যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে জয় পায় ব্রিটেন। এর প্রায় ৩০ বছর পর ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা গণভোটে ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
‘লা নাসিওন’ পত্রিকায় লেখা প্রবন্ধে ২০১৩ সালের এই গণভোটকেও ‘অবৈধ’ দাবি করে ফকল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কির্নো। তাঁর যুক্তি, ‘সময় (অনেক বছর ধরে থাকলেই) কখনো একটি অবৈধ দখলদারিকে সার্বভৌমত্বে রূপান্তর করতে পারে না। সেটি আর্জেন্টিনার প্রজাতন্ত্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকেও খণ্ডবিখণ্ড করতে পারবে না।’
তাঁর মতে ১৯৮২ সালের যুদ্ধ ও ২০১৩ সালের গণভোট ফকল্যান্ড বিরোধের সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব কোনো ‘দখলদার শক্তির কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপনকারী জনসংখ্যা’ দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না বলেও দাবি আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে প্রকাশিত প্রবন্ধে ফকল্যান্ডের ওপর আর্জেন্টিনার আইনি দাবির কথা তুলে ধরেন কির্নো। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দাবি কখনো ম্লান হবে না, আমরা হাল ছাড়ব না। ফকল্যান্ড হলো ইতিহাস, ভূখণ্ড, সমুদ্র, স্মৃতি ও নিয়তি। এটা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যকার একটা অঙ্গীকার। এটা এমন এক জাতির কণ্ঠস্বর যে জাতি আত্মসমর্পণ না করে দাবি জানাতে ও হাল না ছেড়ে অপেক্ষা করতে জানে।’
কির্নোর এসব মন্তব্য মূলত আর্জেন্টিনার সরকারের দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। দেশটিতে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, ফকল্যান্ডের বিষয়ে তাদের দাবি ছিল অভিন্ন। তবে এবার দাবিটিকে এমন এক সময়ে সামনে আনা হলো যখন এ বছরই ট্রাম্প প্রশাসন দ্বীপপুঞ্জটি নিয়ে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করছেন বলে খবর ছড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। যেখানে ফুটবলাররা ড্রেসিংরুমের ভেতর গান গাইছিলেন তাঁরা ‘মালভিনাসের জন্য’ বিশ্বকাপ জিতবেন। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নামই আর্জেন্টিনার কাছে ‘মালভিনাস’।
২০১৩ সালের গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলে কির্নো লিখেছেন, ‘যুক্তরাজ্য কর্তৃক একতরফাভাবে আয়োজিত কোনো গণভোটেরই আইনি কার্যকারিতা থাকতে পারে না।’
গত এপ্রিলে পেন্টাগনের একটি গোপন নথি ফাঁস হয়। সেখান থেকে জানা যায়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিটেনের অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ডের ওপর ব্রিটেনের সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্বিবেচনা করছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তখন তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন এই দ্বীপপুঞ্জ ‘আর্জেন্টিনার ছিল, আছে এবং সব সময় থাকবে।’
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, দ্বীপে বসবাসকারী সব ব্রিটিশ নাগরিকের ‘ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া উচিত।’ এই গোপন নথি এবং আর্জেন্টিনার নেতাদের বক্তব্যগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
ফকল্যান্ড নিয়ে এসব আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল।