মিসরের কোচ হোসাম হাসান
মিসরের কোচ হোসাম হাসান

আর্জেন্টিনা ম্যাচে আড়াআড়ি দুই হাত তুলে কিসের সংকেত দেখান মিসর কোচ

আটলান্টায় নাটকের পর নাটক। বিতর্কের পর বিতর্ক। এর মধ্যেই আর্জেন্টিনা কী অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়াল! দুই গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ গোলের এই অভাবনীয় জয়ের ম্যাচে একটি ঘটনা অনেকেরই চোখে পড়েছে।

যোগ করা সময়ে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে দুই হাত আড়াআড়ি উঁচিয়ে একটি সংকেত দিতে দেখা যায় মিসরের কোচ হোসাম হাসানকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন সংকেতটা কিসের?

তখনকার পরিস্থিতিটা একবার স্মরণ করে দেখা যাক। মাঠে ছিল তুমুল উত্তেজনা। সেটা ছড়িয়ে পড়েছিল ডাগআউটেও। রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন মিসরের কোচিং স্টাফ।

ঠিক তখন মিসরের কোচ হোসাম হাসান ডাগআউটে পায়চারি করতে করতে ওই সংকেত দেখিয়ে সহকারী রেফারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখন মাঠে রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সহকারী রেফারিরা। মাঠে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এরপর মিসরের ডাগআউটের সামনে দাঁড়িয়ে হলুদ কার্ড দেখান হোসাম হাসানকে। মিসরের এই কোচ তখনো দুই হাত আড়াআড়ি উঁচিয়ে ‘এক্স’–সদৃশ সংকেত দেখান।

মিসর কোচের ‘এক্স’ সংকেতের কী অর্থ

কবজি বরাবর দুই হাত আড়াআড়ি করে ‘এক্স’ সংকেত হলো ফিফার অফিশিয়াল বা দাপ্তরিক সংকেত। এর উদ্দেশ্য হলো ম্যাচ চলাকালে বর্ণবাদ বা বৈষম্যমূলক আচরণ শনাক্ত করা।

ফিফার একটি নিয়ম মেনেই ওই সংকেত দেখান মিসর কোচ। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থার বৈষম্যবিরোধী নিয়ম অনুযায়ী ম্যাচে খেলোয়াড়, কোচ কিংবা কর্মকর্তারা বর্ণবাদী বা বৈষম্যবিরোধী আচরণের শিকার হলে হাত দুটো আড়াআড়ি করে তুলে ‘এক্স’ সংকেত দেখিয়ে অভিযোগটি বোঝাতে পারেন।

এই সংকেতের ফলে সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পারেন, সেখানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংকেতটি এমনভাবে করা হয়েছে যেন বৈষম্যের অভিযোগ তুলে যে ব্যক্তি সেটি দেখাচ্ছেন, তিনি যেন অবিচারের শিকার না হন এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ বা প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত কার্যকর করা যায়।

ফিফা কবে এই সংকেত অনুমোদন করে

বর্ণবাদ এবং অন্যান্য বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরদার করতে ২০২৪ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ফিফার ৭৪তম কংগ্রেসে এই পদক্ষেপ অনুমোদিত হয়। বর্ণবাদের সম্ভাব্য ঘটনার ক্ষেত্রে ফিফার নিয়মের তিনটি ধাপ রয়েছে।

এই সংকেত দেওয়ার মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাচটি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং, এটি ফিফা কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতির মধ্যে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। এই নিয়মে সম্ভাব্য তিনটি ধাপ অন্তর্ভুক্ত—

প্রথম পদক্ষেপ: পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে রেফারি সাময়িকভাবে ম্যাচটি স্থগিত করতে পারেন।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ: যদি বৈষম্যমূলক আচরণ বা ঘটনা ঘটতেই থাকে, তবে ম্যাচটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা যেতে পারে এবং উভয় দলকে সাময়িকভাবে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে হবে।

তৃতীয় পদক্ষেপ: চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের আরও ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করতে ম্যাচটি স্থায়ীভাবে বাতিল করা যেতে পারে।

এর মূল উদ্দেশ্য হলো বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রেফারিদের সুযোগ করে দেওয়া। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সরাসরি অভিযোগ জানানোর একটি সুনির্দিষ্ট মাধ্যমও এটি।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে কেন এই সংকেত

ম্যাচে প্রায় শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি (৯০+২) করার পর মিসরের কোচ সংকেতটি ব্যবহার করেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মার্কা’ মিসর কোচের বক্তব্য অনুযায়ী জানিয়েছে, তিনি মনে করেছেন যে গোল উদ্‌যাপনের সময় বর্ণবাদী গালিগালাজের ঘটনা ঘটেছে। তবে অকাট্য প্রমাণ না থাকায় মিসর কোচের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত জিতেছে আর্জেন্টিনা

রেফারি কী করেছেন

রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ম্যাচটি থামাননি। মিসর কোচের সংকেত দেওয়ার পর তাঁকে হলুদ কার্ড দেখান। সিদ্ধান্তটি ফুটবলপ্রেমী ও বিশেষজ্ঞদের দুভাগে বিভক্ত করেছে—একদল মনে করেন যে পরিস্থিতিটি খতিয়ে দেখা উচিত ছিল, অন্য দল মনে করেন এই নিয়ম কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়াটি চালু করার মতো যথেষ্ট উপাদান বা ভিত্তি সেখানে ছিল না।

ফিফার প্রটোকলে নতুন এক মুহূর্ত

২০২৬ বিশ্বকাপই প্রথম পুরুষ বিশ্বকাপ, যেখানে এই অঙ্গভঙ্গি ফিফার অফিশিয়াল ও দৃশ্যমান নিয়মাবলির অংশ করা হয়েছে। এ কারণে জাতীয় দল–সংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় কোনো ব্যক্তির এ সংকেত ব্যবহারের প্রথম আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে হোসাম হাসানের ওই ছবি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।