
পল্টনের উডেনফ্লোর জিমনেসিয়ামের সব আলো যেন নিজের করে নিলেন ম্যাথেনা মাধুর্য্য বিশ্বাস। দীর্ঘ ১১ বছর পর কোর্টে গড়ানো প্রথম বিভাগ ব্যাডমিন্টন লিগের সেরা নারী শাটলারের মুকুট উঠেছে যশোরের এই তরুণীর মাথায়। তবে সাফল্যের গল্পটা শুধু তাঁর একার নয়, এর সমান্তরালে বয়ে চলেছে দুই বোনের এক অবিচ্ছেদ্য আবেগের নদী।
১৮ বছর বয়সী ম্যাথেনা মাধুর্য্য বিশ্বাস ও ১৪ বছর বয়সী মার্গারেট মুগ্ধ বিশ্বাস সম্পর্কে দুই বোন। বাবা মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস ব্যবসায়ী, মা মুক্তা বিশ্বাস স্কুলশিক্ষক। তাঁদের চেনা আঙিনায় সারাক্ষণ একটা খেলারই গুঞ্জন— ব্যাডমিন্টন। অদ্ভুত এক রসায়ন এই দুই বোনের। অনুশীলনের ঘামঝরা দুপুরে ছোট বোনের কোচ হয়ে যান বড় বোন ম্যাথেনা। আবার মাঠের চিরচেনা লড়াইয়ে কখনো তাঁরা এক হয়ে বুক চিতিয়ে লড়েন, কখনো বা জাল ডিঙিয়ে দাঁড়িয়ে যান একে অপরের মুখোমুখি।
যশোরের সেবা সংঘ উচ্চবিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলার কোর্টে দ্বৈতে জুটি বেঁধে খেলেছেন দুই বোন। সেই জেলা পর্যায় থেকে হাত ধরাধরি করেই নাম লিখিয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে। এর মধ্যে বড় বোন ম্যাথেনা ২০২৪ সালের জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে একক ও দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে চিনিয়েছেন।
ছোট বোন মার্গারেটের সাফল্যের খাতাটা এখনো হয়তো কিছুটা শূন্য, তবে তাঁর চোখের কোণে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। বড় বোনের দিকে তাকিয়ে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে মার্গারেট বলেন, ‘আমি এখনো আপুর মতো ভালো করতে পারিনি। তবে চেষ্টা করছি কিছু করার। আপু আমাকে অনেক সহযোগিতা করছেন।’
এবারের লিগ অবশ্য দুই বোনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল পেশাদারত্বের অদ্ভুত দোলাচলে। মার্গারেট লড়েছেন ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের জার্সিতে, আর বড় বোন ম্যাথেনা কোর্ট কাঁপিয়েছেন ইউরোপা ইয়ুথ ক্লাবের হয়ে। অতীতে যে দুই শাটলার বারবার জুটি বেঁধে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করেছেন, এবারের লিগে তাঁরাই ছিলেন একে অপরের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও দিনের আলো নিভতেই মুছে যায় মাঠের বৈরিতা।
আজ যেমন বড় বোন ম্যাথেনার সেরা হওয়ার আনন্দটা ভাগ করে নিয়েছেন ছোট বোন মার্গারেট। পেশাদারত্বের দেয়াল ভেঙে মার্গারেট মেতে ওঠেন দারুণ উচ্ছ্বাসে, ‘অনেক ভালো লাগছে আমার বোন সেরা খেলোয়াড় হয়েছে। একদিন আমিও ওর মতো সেরা হতে চাই।’
যশোরের এই দুই কন্যার রক্তে নেশা আর পেশা হয়ে মিশে আছে ব্যাডমিন্টন। বাবা-মাও তাঁদের ডানা মেলতে দিয়েছেন অন্তহীন আকাশে। কোনো দিন এক ফোঁটা সংশয় প্রকাশ করে বলেননি, ‘এসব খেলে কী হবে!’
মা-বাবার এই অকুণ্ঠ প্রশ্রয়ই আজ তাঁদের মূল শক্তি। নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে প্রত্যয়ী ম্যাথেনা, ‘আমরা দুই বোন। দুই বোনই এখন ব্যাডমিন্টন খেলছি। মা–বাবা সব সময় সাহস দেন। কখনো বলেন না, তোরা পারবি না। তাঁরা চান আমরা নিজেদের মতো কিছু একটা করি।’
এক দশকের বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত ব্যাডমিন্টন লিগের চ্যাম্পিয়ন গুলশান ব্যাডমিন্টন ক্লাব। রানার্সআপ এলোরা শাটলার একাডেমি। সেরা পুরুষ শাটলার হয়েছেন আয়মান ইবনে জামান। এ নামগুলোর পাশে ম্যাথেনা–মার্গারেটের গল্পটা শুধু ট্রফি জয়ের নয়, ব্যাডমিন্টনের টানে দুই বোনের এক অনন্য মেলবন্ধনও।