বড় ভাই সাবেক হকি খেলোয়াড় শাহেনশাহ আলীর দোকানে বই–খাতা বিক্রি এবং কম্পোজের কাজ করেন শাহবাজ
বড় ভাই সাবেক হকি খেলোয়াড় শাহেনশাহ আলীর দোকানে বই–খাতা বিক্রি এবং কম্পোজের কাজ করেন শাহবাজ

খেলাহীন হকিতে সুখবর এনে দিলেন শাহবাজ

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা স্কুলের সামনে ছোট্ট দোকান। চারদিকে বই–খাতার স্তূপ, কম্পিউটারের কি-বোর্ডের শব্দ। সেখানে বসেই কারও চাকরির ফরম পূরণ করছেন, কারও প্রয়োজনীয় নথিপত্র কম্পোজ করে দিচ্ছেন এক যুবক। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই কি-বোর্ড চালানো হাত দুটির ওপরই অনেক সময় নির্ভর করে বিশ্ব হকির বড় বড় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ।

তিনি শাহবাজ আলী, বাংলাদেশের হকি আম্পায়ারিংয়ের এক জীবন্ত বিস্ময়। আম্পায়ারিং ও জীবনের বাস্তবতা—দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শাহবাজের গল্প যেন স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বিনয়ের এক অনন্য উদাহরণ।

‎সম্প্রতি আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশন (এফআইএইচ) থেকে দারুণ সুসংবাদ পেয়েছেন শাহবাজ। এফআইএইচ তাঁকে প্রাথমিক আন্তর্জাতিক প্যানেল থেকে সরাসরি ‘হাই পটেনশিয়াল প্যানেলে’ উন্নীত করেছে। এই অর্জনের মাহাত্ম্য বুঝতে একটি তথ্যই যথেষ্ট—সারা বিশ্বের মাত্র ১২ জন আম্পায়ার এই প্যানেলভুক্ত।

আরও বিস্ময়কর হলো, পুরো এশিয়া মহাদেশ থেকে শাহবাজ এই তালিকায় বর্তমানে একমাত্র প্রতিনিধি। অর্থাৎ এশিয়ান হকির আম্পায়ারিংয়ের ঝান্ডা এখন এককভাবে বইছেন এই বাংলাদেশি। এর ফলে এখন থেকে তিনি হকির প্রো–লিগ, অলিম্পিক, বিশ্বকাপ এবং কমনওয়েলথ গেমসের মতো সর্বোচ্চ স্তরের ম্যাচগুলো পরিচালনা করার সুযোগ পাবেন।

পুরো এশিয়া মহাদেশ থেকে শাহবাজ এই তালিকায় বর্তমানে একমাত্র প্রতিনিধি

এফআইএইচের নিয়ম অনুযায়ী, পরপর দুটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অন্তত ৮০ নম্বর পেলে একজন আম্পায়ার পরবর্তী প্যানেলে পদোন্নতি পাবেন। শাহবাজও এই দুই পরীক্ষায় সাফল্যের সুবাদে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক আন্তর্জাতিক প্যানেল থেকে তিনি ‘হাই পটেনশিয়াল প্যানেলে’ উন্নীত হন।

শাহবাজের মাঠের বাইরের জীবন অবশ্য এতটা বর্ণাঢ্য নয়। হকির আম্পায়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় অর্জন থাকলেও নেই ভালো একটা চাকরি। বড় ভাই সাবেক হকি খেলোয়াড় শাহেনশাহ আলীর দোকানে বই–খাতা বিক্রি এবং কম্পোজের কাজ করেন।

গত ডিসেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে আম্পায়ারিং করেন শাহবাজ

শাহবাজের আক্ষেপ, ‘অনেক সংস্থা ও কোম্পানিতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু আম্পায়ারিংয়ের জন্য ছুটির ব্যবস্থা না থাকায় চাকরি হয়নি। কী করব, একটা কিছু তো করা লাগবে। এই সরকার যেন আমাদের মতো আম্পায়ার-রেফারিদের দিকে একটু সুনজর দেয়।’

‎বাংলাদেশে বর্তমানে আন্তর্জাতিক আম্পায়ার আছেন মাত্র দুজন, সেলিম লাকি ও শাহবাজ। শাহবাজের দুচোখে এখন একটাই স্বপ্ন—২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে আম্পায়ারিং করা। সে জন্য এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বিশেষ প্রকল্পের অধীনে তিনি নিয়মিত কাজও করছেন।

স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে শাহবাজ বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো আম্পায়ার এর আগে অলিম্পিকে গেছেন কি না আমার জানা নেই। আমি যদি যেতে পারি, তবে দেশের জন্যই বিশাল প্রাপ্তি হবে।’

অনেক বছর ধরেই দুর্দিন যাচ্ছে বাংলাদেশের হকির। ঘরোয়া হকি মানেই যেন বিতর্ক, বড় কোনো সাফল্য নেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তার মধ্যেও আম্পায়ার শাহবাজ আলী যেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।