নিউইয়র্কের রাত কখন ভোরে গড়ায়, বোঝা যায় না সব সময়। কিন্তু আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামের গত রাতটা যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছিল। আলো নিভে যাওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই। তবু খেলা চলেছে। দর্শকের গলা শুকিয়েছে, তবু চিৎকার থামেনি। আর সেই রাতের শেষ প্রহরে ইউএস ওপেন দেখল বিশাল এক চমক।
নিউইয়র্কের আকাশ ভোরের স্পর্শ পাওয়ার কিছুটা আগে ইতিহাস গড়লেন বেন শেলটন। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কার্লোস আলকারাজকে ৬-৭ (৭/৫), ৬-১, ৬-৩, ১-৬, ৭-৬ (১০/৭) গেমে হারিয়ে পৌঁছে গেলেন ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে। ম্যাচটা শেষ হয়েছে স্থানীয় সময় ভোররাত ৩টা ৩৩ মিনিটে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে আর কোনো ম্যাচ এত দেরিতে শেষ হয়নি কখনো।
এই জয়ে শেলটনের সামনে খুলে গেছে স্বপ্নের এক দরজা। শেষ চারে তাঁর প্রতিপক্ষ স্বদেশি ফ্রান্সেস টিয়াফো। ২০০৩ সালের পর কোনো আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড় গ্র্যান্ড স্লাম জেতেননি। সেই অপেক্ষা এবার ফুরাবে কি?
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫ মিনিটে শুরু হয়েছিল ম্যাচ। আলকারাজকে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছিল শুরুতে। লাগারই কথা, গ্র্যান্ড স্লামে আমেরিকানদের বিপক্ষে ১৩-০ রেকর্ড নিয়ে খেলতে নেমেছেন। কিন্তু শেলটন যে এভাবে গল্পটা বদলে দেবেন, কে জানত।
প্রথম সেটে টাইব্রেকে ৬-৭ (৭-৫) গেমে জিতে আলকারাজ যখন এগিয়ে গেলেন, মনে হয়েছিল, চেনা চিত্রনাট্যই বুঝি মঞ্চায়িত হতে চলেছে। কিন্তু দ্বিতীয় সেটে হঠাৎ করেই কেমন যেন ছন্দ হারালেন স্প্যানিশ তারকা। আনফোর্সড এররের মিছিল, ফোরহ্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা আলকারাজকে একপ্রকার উড়িয়ে দিয়ে ৬-১ ব্যবধানে সেট তুলে নেন শেলটন। পরের সেটেও ধরে রাখলেন সেই চাপ, জিতে নিলেন ৬-৩ ব্যবধানে।
তবে চ্যাম্পিয়নরা সহজে হাল ছাড়েন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে, এমনকি বিরতির সময় তোয়ালেতে বমি করে হলেও চতুর্থ সেটে হুংকার ছাড়লেন আলকারাজ। ৬-১ ব্যবধানে সেই সেট জিতে খেলা নিয়ে গেলেন পঞ্চম সেটে। লড়াই গড়াল মহানাটকের শেষ অঙ্কে। শেষ সেটে ১২ গেম পর্যন্ত লড়াই হয়েছে সমানে সমান। কিন্তু শেষ হাসি শেলটনের। ৪ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের ম্যারাথন শেষে জয় তাঁরই।
ম্যাচ শেষে শেলটনের কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, ছিল আবেগও, ‘আমার কাছে সব সময় দর্শকেরাই শক্তি। কোচ, পরিবার, বন্ধুরা ছিল। আর ছিল নিউইয়র্ক শহর। রাত ৩টা পর্যন্ত তারা “ইউএসএ” বলে চিৎকার করেছে। ওটাই আমাকে চালিয়ে নিয়েছে। ওটাই আমাকে জিতিয়েছে।’ আরও যোগ করলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। আমি সব সময় বলি, এটা বিশ্বের সেরা ক্রীড়া শহর। এই স্টেডিয়ামও সেরা।’
হাসতে হাসতেই বললেন, ‘আশা করি, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের আর বোনের তিন ঘণ্টা পর কাজে যেতে হবে না! যদি আজ ছুটি পায়, তাদের অফিসের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।’ শেষে প্রতিপক্ষকে ভুললেন না শেলটন, ‘কার্লোসের সঙ্গে একই কোর্টে খেলাটা সম্মানের। এখানে প্রতিটা মুহূর্ত আমি উপভোগ করি।’
হেরে গিয়েও অজুহাত খোঁজার চেষ্টা করেননি আলকারাজ; বরং যে প্রতিপক্ষের হাতে তাঁর রাজত্ব হাতছাড়া হয়েছে, সেই বেন শেলটনকে ভাসালেন প্রশংসার বন্যায়, ‘আমি এমন একজনের বিপক্ষে খেলছিলাম, যে আজ পুরো একটা দানব হয়ে উঠেছিল। শেলটন অবিশ্বাস্য একজন খেলোয়াড়, সামর্থ্য আর শক্তিতে ভরপুর। ম্যাচের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে সে ভীষণ ভালো খেলেছে।’