
কেউ এসেছে শিক্ষকের হাত ধরে, কেউবা মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গেও এসেছে অনেকে। কেউ নিয়ে এসেছে তার উদ্ভাবনী প্রকল্প, কারও বগলে পোস্টার আর কেউ কেউ উপস্থাপন করবে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ। কেউ কেউ তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আর বড়রা দ্বাদশ শ্রেণির। গত ২৯ ও ৩০ আগস্ট ঢাকার আগারগাঁওয়ের বিজ্ঞান জাদুঘরে বসেছিল এ রকম অনেক খুদে বিজ্ঞানীর মিলনমেলা। সেখানে হয়েছে দুই দিনব্যাপী ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৪।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে খুদে বিজ্ঞানীরাও নানা প্রকল্প তৈরি করেছে এ বিষয়ে। অন্ধজনের পথ চলতে গুগল গ্লাস আকৃতির ব্লাইন্ড গ্লাস, পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টিভাইরাস, বাসায় চোর এলে মোবাইলে বার্তা পেয়ে যাওয়ার হোম সিকিউরিটি সিস্টেমসহ আরও কত কিছু ছিল দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই বিজ্ঞান কংগ্রেসে। বিশ্বখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বিজ্ঞান মেলা এবং ইন্টেলের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলার জন্য দেশের শিশু-কিশোরদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের কলাকৌশল চর্চা বাড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়েই এ আযোজন করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি। পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক লিমিটেড। সহযোগী হিসেবে ছিল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বেসিস, কিশোর আলো, রকমারি ডট কম ও জিরো টু ইনফিনিটি।
দেশের নানা প্রান্ত আসা খুদে বিজ্ঞানীরা নিজেদের উদ্ভাবন বা গবেষণাকে সবার সামনে উপস্থাপন করেছে। এ ছাড়া তারা অংশ নিয়েছে বিজ্ঞান কুইজ এবং দেশসেরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথ কংগ্রেসে, পাস করেছে কংগ্রেস ঘোষণা। সঙ্গে ছিল ড্রোন, রোবট, জাদুঘর প্রদর্শনী ছাড়াও অনেক কিছু।
উদ্ভাবিত প্রকল্প: নতুনত্বের সমাহার
রোববার সকাল ১০টা। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ঢাকার শাহবাগে। হঠাৎ লক্ষ করলেন, কোনো যানবাহন সিগন্যালে আটকে থাকছে না। সব বাহনই গন্তব্যে চলে যাচ্ছে সিগন্যালে না থেমেই। এটা কি বাস্তবে সম্ভব? তার উত্তরে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির সালসাবিল ইসলাম জানায়, অবশ্যই সম্ভব! কীভাবে সম্ভব? সালসাবিলের ‘ট্রাফিক সিগন্যাল বিহীন চৌরাস্তা’ই এই প্রশ্নের জবাব। এ রকম নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে মোট প্রকল্প ছিল ১৬৩টি। নাটোর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী তৈরি করেছে কম্পিউটারকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টিভাইরাস ‘বিডি-গার্ড’। ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মিনার আহমেদ তৈরি করেছে ‘ব্লাইন্ড গ্লাস’। এটি অন্ধরা পরে একাই পথ চলতে পারবে। সামনে কোনো বাধা থাকলে কাঁপতে থাকবে চশমাটি। চশমাটি বানাতে তার খরচ হয়েছে মাত্র ৪০০ টাকা। উত্সবে অংশগ্রহণকারী ফারদিম বানিয়ে এনেছিল ঘরে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে হোম সিকিউরিটি সিস্টেম; অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ ঘরে ঢুকলে খুদে বার্তা চলে যাবে মালিকের কাছে।
বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের উপস্থাপনা
সাপ শুধু মানুষের শক্র নয়, এটি মানুষের অনেক উপকারেও আসে। বাংলাদেশে সাপের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক সম্ভবনা নিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করে স্কলাস্টিকা স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াসি রহমান চৌধুরী।
দিনের কোন সময়ে পড়াশোনা করলে বেশি মনে থাকে, মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তি না আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেয়, ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা গণিতে বেশি ভালো কি না ইত্যাদি প্রশ্নের জবাবও খুঁজেছে আমাদের খুদে বিজ্ঞানীরা তাদের উপস্থাপিত ১১১টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে। এমনকি একটি গবেষণায় ‘প্রফেসর শঙ্কুর আজব কাণ্ডকারখানা বৈজ্ঞানিক উপায়ে অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ’ করিয়ে দেখিয়েছে খুদে বিজ্ঞানীদের একটি দল। কংগ্রেসের আহ্বায়ক এবং প্রধান বিচারক বুয়েটের শিক্ষক ফারসীম মান্নান মোহম্মদী জানান, গতবারের চেয়ে নিবন্ধের মান যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। এটি আরও উন্নত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
গবেষণা উপস্থাপনের শৈল্পিক উপায়
গবেষণা উপস্থাপনের বহুল ব্যবহৃত আরেকটি মাধ্যম পোস্টারেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য দেখিয়েছে খুদে বিজ্ঞানীরা। মোট ৭৬টি পোস্টারের মধ্যে প্রথম শ্রেণির দুজন শিক্ষার্থীর বাজারের সাত ধরনের লবণের মধ্যে আয়োডিনের উপস্থিতিবিষয়ক একটি পোস্টারও ছিল। পোস্টারের বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল বাড়ি তৈরিতে টাইলসের যৌক্তিকতা, কিশোর বয়সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ও তার প্রতিকার, পানি বিশুদ্ধকরণে ইউভি বাতির ব্যবহার, চুলে তেল ব্যবহারে চুলের বৃদ্ধির ওপর প্রভাব ইত্যাদি।
যৌথ কংগ্রেস
দ্বিতীয় দিন দুপুরের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঞ্চালনায় খুদে বিজ্ঞানীরা যৌথ কংগ্রেসে অংশ নেয় দেশের প্রথম সারির কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। শাবিপ্রবির অধ্যাপক ইয়াসমিন হক, বিজ্ঞানী রেজাউর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরশাদ মোমেনসহ অন্য বিজ্ঞানীরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌথ আলোচনায় অংশ নেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞানের অবস্থা এবং গবেষণার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শেষে কংগ্রেসের যৌথ ঘোষণা গৃহীত হয়।
আমাদের জার্নাল
বাংলাদেশের খুদে বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রকাশের জন্য চালু হয়েছে ‘আমাদের জার্নাল’ (www.amaderjournal.com) নামের একটি অনলাইন জার্নাল। এটি সম্পাদনা করবেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। কংগ্রেসের দ্বিতীয় দিনে এটি প্রকাশিত হয়।
অন্যান্য আয়োজন
মূল আয়োজন ছাড়াও কংগ্রেসের প্রথম দিন উদ্বোধনের পর সবাই মেতে ছিল এক ঘণ্টার একটি বিজ্ঞান কুইজে। প্রায় এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয় কুইজে। এর পরপরই অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল চমক। হঠাৎ করেই আগারগাঁওয়ের আকাশে দেখা যায় ড্রোন! শিশু-কিশোরদের চোখ তখন আকাশপানে। ছিল এমন রোবট, যা মানুষের উপস্থিতি টের পেলে তার যাত্রাপথ পাল্টে ফেলে। বাংলাদেশি গবেষকদের এই উদ্ভাবন শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
কংগ্রেসের সমাপ্তিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান মনে করেন, শিক্ষার্থীদের যত বেশি বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা যাবে, দেশ তত তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাবে।
আয়োজন সম্পর্কে এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ! গণিত অলিম্পিয়াড যেমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি দূর করার ব্যাপারে কাজ করছে, তেমনি বিজ্ঞানের বিষয়গুলো জনপ্রিয় করে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ সহায়তা করবে।’
কিশোর আলোর সম্পাদক আনিসুল হক একটি শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে সবকিছু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের পথে ও মতে নিজেদের আরও বিকাশের অঙ্গীকার করে খুদে বিজ্ঞানীরা। শেষ হয় এবারের বিজ্ঞান কংগ্রেস।