চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঝুপড়ি-কাব্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুপড়িতে চলছে শিক্ষার্থীদের আড্ডা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুপড়িতে চলছে শিক্ষার্থীদের আড্ডা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন-পাহাড়ের মাথায় এসে বসেছে পরিযায়ী মেঘের দল। দমকা হাওয়ায় টুপটাপ ঝরছে জারুল আর কৃষ্ণচূড়ার রঙিন ফুল। পাহাড়ের ভাঁজে ফুটেছে কদম। হঠাৎ কোত্থেকে যেন ভেসে এল একটা কান্নাভেজা সুর। সুরের উৎসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম কলাভবনের ঝুপড়িতে। উদ্দেশ্য বাঁশি শোনা। এখানে সবটুকু দাপটই তারুণ্যের দখলে। বৃষ্টি উপলক্ষে জোরালো হলো তাদের আনন্দধ্বনি, বিচিত্র সব গান বেজে উঠল ঝুপড়ির নানা প্রান্তে। এভাবেই শুরু হলো বৃষ্টিবরণ। ‘সারা দিন বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টিধারা’ অথবা ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ আর রবীন্দ্রনাথের গান তো আছেই—যেন এক বিরামহীন কনসার্ট। গাইছে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী সবুজ আর বাকিরা বেঞ্চ চাপড়ে তুলছেন তবলার তাল।ঝুপড়ির একই অঙ্গনে চলে নানা চর্চা। চারুকলার শিক্ষার্থী তানভীর একপাশে চুপচাপ বসে ছবি আঁকছিলেন। বললেন, ‘পরীক্ষার পড়া থেকে শুরু করে সাহিত্য, দর্শন সব শাস্ত্রেরই উন্মুক্ত পাঠশালা আমাদের ঝুপড়ি। এক কোণে পরিসংখ্যানের রানার সামনে বই-খাতা খুলে বসেছিলেন অর্থনীতির শিক্ষার্থী জেনী, মোনা, জুয়েল আর সুমন। একটু পরই জুয়েল বলে উঠলেন, ‘না ভাইয়া, এই ভরাবাদলে পড়াশোনা ভাল্লাগছে না’। ফলাফল গান, আড্ডা, সঙ্গে চা আর ছোলা-মুড়ি । ‘মারা যাব, স্রেফ মারা যাব। ঝুপড়ির আড্ডা ছাড়া নিজেকে আমি ভাবতেই পারি না’—এভাবেই নিজের ঝুপড়িপ্রীতির কথা বলছিলেন সুমন।ঝুপড়ির বিভিন্ন কোনায় বসে আরও কয়েকটি দল সেরে নিচ্ছে জরুরি মিটিং। সিরিয়াস ভঙ্গিতে ক্যাম্পাসের রাজনীতিবিদেরা স্থির করছেন দলের পরবর্তী কর্মসূচি। ইংরেজি বিভাগের বোরহান, মনীষা, আজাদ আলাপ করছেন নিজেদের প্রকাশিতব্য লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে। আরেক দল মার্ক্সবাদের ব্যবচ্ছেদ করছেন। সৌম্য আর খালেদের তো ‘বাদ’ নিয়ে বাদানুবাদ হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাওয়ার উপক্রম। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, এখানে বাদানুবাদেরও একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য আছে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে এখানে সবই উজ্জ্বল, সবই প্রাসঙ্গিক। ঝুপড়ি মানেই অক্লান্ত আবেগ, অশেষ আড্ডা আর স্বপ্ন দেখার দুর্দান্ত সাহস।বাংলা বিভাগের আড্ডাবাজ শাহীন বললেন, ‘বেশির ভাগ সময়ই আমাদের আড্ডার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় থাকে না, গল্পের কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না।’ সত্যিই, ঝুপড়ির অধিকাংশ আড্ডাই এলোমেলো কথার প্রান্তরে অবিরাম উড়ে চলা; জলের মতো ঘুরে ঘুরে কলকল কথা বলে চলা। এই কথাব্যস্ত ছোট ছোট বৃত্তে আবদ্ধ তারুণ্যকে দেখে মনে হয়, এঁদের মধ্যে এমন কোনো ফাঁক নেই যা গলে বিষাদ ঢুকতে পারে। এদের দুঃখের সঙ্গে চেনাজানা হয়নি এখনো।

আজ সকাল নয়টায় ক্লাস ছিল দর্শনের শিক্ষার্থী শিউলির। তাই দুপুর হতে না হতেই খিদে পেয়ে গেছে। হায়দার ভাইয়ের দোকানে এসে বলতেই ব্যবস্থা হয়ে গেল। তার জন্য বড় উনুনের ভেতর সেঁকা হচ্ছে নানরুটি। গল্পের ফাঁকে তাঁর বন্ধুরা খাচ্ছেন ডিম-খিচুড়ি, ছোলা-মুড়ি, কেউ বা খাচ্ছেন তেলেভাজা খাবার।

কিছুক্ষণের দেখায় ঝুপড়িকে আমার মনে হলো একটি অনবদ্য উপন্যাস। বিচিত্র তার কুশীলব। বাংলার কবি চয়ন চক্রবর্তী তাঁর প্রথম কাব্যের প্রচার চালাচ্ছেন; ক্যাম্পাসভিত্তিক পত্রিকার সম্পাদক কাম হকার আরাফাতুর রহমান তাঁর পত্রিকা বিক্রির চেষ্টা করছেন—এমন অসংখ্য চরিত্র নিজের অবস্থান আর রুচি অনুযায়ী ঝুপড়িকে সাজিয়েছে নিজেদের মতো করে। এতসব বিচিত্র প্রাণের নিত্য আনাগোনায়, সযত্ন সজ্জায় ঝুপড়ি হয়ে উঠেছে চবি শিক্ষার্থীদের এক উদ্দাম উল্লাসের অভয়াশ্রম।