
বাসা বদল করা নাগরিক জীবনেরই একটি অংশ। পুরোনো বাসা ছেড়ে নতুন বাসায় যাওয়ার সময় হয়তো আপনার টুথব্রাশ বা অন্য কোনো নিত্যব্যবহার্য জিনিসটি ফেলে দিচ্ছেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও সেই পুরোনো বাসার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবগুলোকে ফেলে যেতে পারবেন না। কারণ, এরা মানুষের সঙ্গী হয়ে নতুন আবাসে পৌঁছে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক এ তথ্য জানিয়েছেন।
মানুষ যেখানেই যাক না কেন, অণুজীবগুলো সঙ্গ ছাড়ে না। আর নতুন ঠিকানায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এরা সারা ঘরবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা পুরো বাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বাসাবাড়ির অণুজীব এবং এদের বিস্তারের ধরন নিয়ে গবেষণা করেন। এতে নেতৃত্ব দেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জ্যাক গিলবার্ট। তাঁরা প্রথমে মানুষের শরীর থেকে কোনো স্থানে অণুজীবগুলোর ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতি অনুসন্ধান করেন। পরে আবাস থেকে মানুষের শরীরের মাধ্যমে অণুজীব পরিবাহিত হওয়ার ধরন নিয়েও গবেষণা করা হয়।
অণুজীব মানেই অতিক্ষুদ্র। এতটাই ছোট যে অণুবীক্ষণযন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপ ছাড়া খালি চোখে এগুলো দেখার উপায় নেই। অণুজীব এককোষী ও বহুকোষী—দুই রকমেরই হতে পারে। এদের মধ্যে আছে ব্যাকটেরিয়া ও প্রায় সব ধরনের এককোষী জীব। নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানী অ্যান্টনি ফন লিউয়েনহুক ১৬৭৫ সালে প্রথম অণুজীব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
গবেষক জ্যাক গিলবার্ট বলেন, কিছু অণুজীব মানুষের ওজন বাড়ায়, আবার কিছু অণুজীব স্নায়বিক বিকাশে প্রভাব ফেলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের লক্ষ্য ছিল অণুজীব কীভাবে মানুষের কাছে আসে, তা খুঁজে বের করা।
গবেষকেরা বলেন, মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষের বিপরীতে অণুজীব থাকে ১০টি। মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রশ্বাস ও কাশির সঙ্গে অণুজীবগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া মানুষের শরীর থেকে ত্বকের কোষ পড়ে যাওয়া এবং শরীর মাটি স্পর্শের মাধ্যমেও কিছু অণুজীব পরিবেশে ছড়ায়। বিষয়টি নির্ভর করে কোন স্থানে মানুষ কতক্ষণ অবস্থান করছে, তার ওপর। অণুজীব সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ছড়ায় মানুষের বাসস্থানে।
মানুষের শরীর ও বাসস্থানে অণুজীবের বিস্তার নিয়ে গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থা ও জাতিসত্তার সাতটি পরিবার নির্বাচিত করা হয়। ওই পরিবারগুলোর সঙ্গে অবস্থানকারী অণুজীবগুলো শনাক্ত করা হয়। এসব পরিবারের মধ্যে তিনটি বাসা বদল করছিল। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে সাতটি পরিবারের ১৮ সদস্যের পা, হাত ও নাক মুছে নেওয়া হয়। একইভাবে তাঁদের ব্যবহার করা দরজার হাতল, মেঝে, বাতির সুইচ ও রান্নাঘরের পাটাতন থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পরিবারগুলোর সঙ্গী পোষা প্রাণীর শরীর থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে গবেষণাগারে সংগৃহীত নমুনাগুলো জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলাদা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় গবেষকেরা ২১ হাজার অণুজীব প্রজাতি আলাদা করতে সমর্থ হন। তাঁরা বলেন, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনায় প্রাপ্ত অণুজীবে সেই সব মানুষের চিহ্ন রয়ে যায়। আর সেই চিহ্ন অনুসরণ করে নির্দিষ্ট অণুজীবগুলো দ্রুত ওই পরিবারের বাসস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা নতুন বাসায় আগে থেকে অবস্থানকারী অণুজীবগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
হোটেলে অবস্থানকারী একটি পরিবারকে পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, তাদের সঙ্গে থাকা অণুজীবগুলো মাত্র তিন ঘণ্টায় হোটেলকক্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। আর নতুন বাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে তারা সময় নিয়েছে মাত্র ২৪ ঘণ্টা। গবেষক গিলবার্ট বলেন, অণুজীবের ওপর গবেষণার ভিত্তিতে এখন কোনো বাড়ির লোকজনের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানা সম্ভব। এ ছাড়া জানা সম্ভব, কোন বাড়িতে কতজন বাসিন্দা এবং তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন ইত্যাদি।
নিউসায়েন্টিস্ট