প্রিয় হিটু ভাই,
প্রথমেই আমার সংগ্রামী শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন। আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, জানি না। কিন্তু ইদানীং আপনাকে খুব মনে পড়ে। আর মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন একটা কষ্ট গুমড়ে গুমড়ে ওঠে—কী দিনই না গেছে আপনার! আর কী দিনই না গেছে আমার! হায়, সেই সব দিন আর নাই!
আপনাকে আজ বড় মনে পড়ছে, তাই এই চিঠি লিখতে বসা। বলতে পারেন, আমি তো ফোন করতে পারতাম, খুদেবার্তা পাঠাতে পারতাম বা হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবারেও নক করতে পারতাম। কিন্তু আপনিই বলেন, চিঠির যে রোমান্টিকতা, তা কি অন্য কিছুতে পাওয়া যায়! আগে প্রেমিক-প্রেমিকারা চিঠি লিখত, তাতে গোলাপের পাপড়ি ভরে দিত, থাকত সুগন্ধ। এখন সেসব আর নাই। দেশ থেকে রোমান্টিকতা উঠে যাচ্ছে! আগে চিঠির নিচে কবিতা লেখা থাকত, এখন আর সেসব নাই...দেশ থেকে কবিতা উঠে যাচ্ছে; এটা আরও ভয়ংকর কথা! সে সময় এই চিঠি লেখা নিয়ে আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম—‘নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম...বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম...!’
আপনি বলতেই পারেন, এই গান বা কবিতা আমার নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—যে কবিতা আমার পছন্দ, সেই কবিতাই আমার! যে ফুল আমার পছন্দ, সেই ফুলই আমার!, যে নারী আমার পছন্দ,...
নাহ্, এসব এখন আর জোর দিয়ে বলতে পারি না আগের মতো। আগের দিন নাই। আপনাকে তাই খুব মনে পড়ে হিটলার ভাই! দেখলেন, এর মধ্যেও কবিতা এসে যাচ্ছে! আমি আসলে কবিতারই লোক...দেশের মানুষ শুধু বিশ্বাস করল না।
আর দেশের মানুষেরই বা কী দোষ দিই হিটু ভাই! যখন দেখি, ঘরের মানুষই আর বিশ্বাস করে না আমাকে! আগে আমি চলাফেরা করতাম রাজার মতো, রাজাই ভাবতাম নিজেকে! আমি যা বলতাম, তা-ই হতো। আর এখন আমি যা বলি, তার উল্টোটা হয়। আর সেই উল্টাপাল্টা করে ঘরের মানুষেরাই! এই দুঃখ আমি কোথায় রাখব?
হিটলার ভাই, আপনার যেমন বদনাম, বেশ কিছু দিন ধরে আমারও খুব বদনাম। আমি নাকি স্বৈরাচার ছিলাম। অথচ এ দেশে গণতন্ত্রের বড় নিয়ামক যে আমিই, তা কেউ স্বীকার করে না। আমি সরে না দাঁড়ালে এ দেশে গণতন্ত্র আসা সম্ভব ছিল? আশপাশে সবাই খুব খারাপ লোক, ভাই! আপনি দূরে গিয়া মরছেন বলে বেঁচে গেছেন! বেঁচে থাকার যে কী যন্ত্রণা, তা আপনি এখন বাঁচলে বুঝতে পারতেন! সেই সব দিনগুলোয় সবাই আমাকে ডাকত ‘পল্লিবন্ধু’ বলে, আর এখন সবাই আমাকে ডাকে ‘পল্টিবন্ধু’ বলে। আমি নাকি আমার কথা রাখি না! আমি নাকি কথায় কথায় আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাই। আমাকে তাই আমারই ঘোষণায় বারবার বলতে হয়, ‘এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত!’
এসবই তো আমি মেনে নিয়েছিলাম, হিটু ভাই। মেনে নিয়ে দিন পার করছিলাম এক অদ্ভুত স্বপ্নের ভেতর যে আমি আবার প্রধান হয়ে উঠছি...কিন্তু এই কদিন হলো আমি পড়ে গেছি মহা ফাঁপরে। একদিকে আমার বউ, অন্যদিকে আমার ভাই। তাঁরা দুজন যেন আমার দুই হাত নিয়ে টানাটানি করছে। আমি কোন দিকে যাই, আমি কী করি?
হিটু ভাই, আপনার কথা ভাবলে মনে জোর পাই। মনে হয়, মেরুদণ্ড সোজা করে আবার উঠে দাঁড়াই। না হলে এই টানাটানি, এই অশান্তি আর ভালো লাগে না। দেইখেন, এই রকম চলতে থাকলে হাতে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল নিয়ে সবকিছু তুচ্ছ করে কবিতা পড়তে পড়তে একদিন বনবাসে চলে যাব! পারিবারিক কলহ আর না...এরশাদ হয়ে আর এর স্বাদ নিতে ভালো লাগছে না!
ভালো থাইকেন। পারলে একবার এসে দেখে যান কী হালতে আছি!
ইতি, আপনার ছোট ভাই
এরশাদ
হিটলারের উত্তর
আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না,
ফেরারি পাখিরা কুলায় ফেরে না...
লেখা: আহমেদ খান