ওরিগামি রোবট
ওরিগামি রোবট

নিজে নিজে ভাঁজ হওয়া ওরিগামি রোবট বানাল এমআইটি

মানুষের তৈরি প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। একটুকরা সাধারণ প্লাস্টিক মানুষের হাত ছাড়াই নিজে নিজে রোবট হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের এই খুদে রোবটগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসতে চলেছে।

গবেষণাগারে একটি গরম পৃষ্ঠের ওপর প্লাস্টিকের সমতল টুকরা রেখে দিন। মানুষের হাত, মোটর বা জটিল কোনো যন্ত্রাংশ ছাড়াই সেটি নিজে নিজে একটি কার্যকর রোবটে রূপান্তরিত হবে। এটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকেরা ঠিক এই কাজই করে দেখিয়েছেন। ওরিগামি শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা একটি ক্ষুদ্র রোবট তৈরি করেছেন। ২০১৫ সালে প্রথম উন্মোচিত এই রোবট নিজে নিজেই অ্যাসেম্বল বা তৈরি হতে পারে।

এক সেন্টিমিটার লম্বা এই যন্ত্র প্রমাণ করেছে সাধারণ উপাদান এবং ওরিগামি শিল্প মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের ক্ষুদ্র রোবট তৈরি সম্ভব। এটি একটি পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক সংস্করণ। চিকিৎসাক্ষেত্র কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় এ ধরনের রোবট ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রথাগত যন্ত্রপাতির জন্য যেসব জায়গা খুব ছোট বা বিপজ্জনক সেখানে এই রোবট সহজেই কাজ করতে পারবে। এমআইটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ল্যাবরেটরিতে এই রোবট তৈরি করা হয়েছে। রোবটটি শুরুতে তিনটি স্তরের উপাদানের একটি সমতল কাঠামো হিসেবে থাকে। এর মাঝখানের স্তরটি তৈরি পলিভিনাইল ক্লোরাইড দিয়ে। এই প্লাস্টিক উত্তপ্ত হলে সংকুচিত হয়। এর ওপরের ও নিচের স্তরে লেজার-কাট করা নির্দিষ্ট প্যাটার্নের দাগ থাকে। দাগগুলোই ভাঁজ হওয়ার প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে। শিটটিকে প্রায় ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। তখন পিভিসি স্তরটি সংকুচিত হতে শুরু করে। এর ফলে পুরো কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাঁজ হয়ে যায়। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এটি একটি ত্রিমাত্রিক রোবটে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে যা বেরিয়ে আসে তা হলো একটি মিনি রোবট। এটি দৈর্ঘ্যে মাত্র ১.৭ সেন্টিমিটার এবং ওজনে মাত্র ০.৩১ গ্রাম।

ভাঁজ হওয়ার পর রোবটটিকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। এর পিঠে একটি ছোট স্থায়ী চৌম্বক লাগানো থাকে। বাইরের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সাহায্যে এটিকে পথ দেখানো হয়। এই সাধারণ নকশার কারণে এটি সমতলপৃষ্ঠে হামাগুড়ি দিতে পারে। এটি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে পারে। আঁকাবাঁকা জায়গায় চলাফেরা করতে পারে। এমনকি এটি পানির মধ্যে সাঁতার কাটতেও সক্ষম। ওজন এক গ্রামের তিন ভাগের এক ভাগ হলেও রোবটটি নিজের ওজনের দ্বিগুণ ভার বহন করতে পারে। এটি প্রতি সেকেন্ডে নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের চার গুণ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এই প্রজেক্টের বিজ্ঞানী সিনথিয়া আর সাং বলেন, রোবটের নড়াচড়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এর মেকানিক্যাল ডিজাইনের ভেতরেই গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগের ওরিগামি রোবটের মতো এতে কোনো অনবোর্ড মোটর বা জটিল অ্যাকচুয়েশন সিস্টেমের প্রয়োজন হয় না। এই প্রকল্পের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ দিক এটি বর্তমানে কী করতে পারে তা নয়। ভবিষ্যতে এটি কী হতে পারে তা নিয়েই বিজ্ঞানীরা বেশি আশাবাদী। এমআইটি দল এমন ক্ষুদ্র বায়োকম্প্যাটিবল বা শরীরের উপযোগী সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছে। রোগীরা এটি গিলে ফেলতে পারবে কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো যাবে। এটি শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ভ্রমণ করবে। নির্ধারিত চিকিৎসা কাজ শেষ করবে। কাজ শেষে এটি শরীরের ভেতরেই নিরাপদে গলে যাবে। এই সম্ভাবনা পরীক্ষা করার জন্য গবেষকেরা তরল-দ্রবণীয় উপাদান ব্যবহার করে প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন। একটি সংস্করণ অ্যাসিটোনের মধ্যে পুরোপুরি দ্রবীভূত হয়ে যায়। অন্য সংস্করণটিতে এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা পানিতে মিশে যায়। গলনের পর সেখানে শুধু ছোট স্থায়ী চৌম্বকটি অবশিষ্ট থাকে।

পোস্টডক্টরাল গবেষক শুহেই মিয়াশিতা বলেন, রোবটটির সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য এই ধারণা ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি নিজে নিজেই তৈরি হবে, কাজ করবে এবং ব্যবহারের পর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এর আগে ২০১৬ সালে এমআইটি একটি গেলা যোগ্য বা ইনজেস্টেবল ওরিগামি রোবট প্রবর্তন করে। এটি একটি কৃত্রিম পাকস্থলীর ভেতরে নিজে নিজেই খুলে যেতে পারত। চৌম্বকীয় উপায়ে চালিত হয়ে এটি দুর্ঘটনাবশত গিলে ফেলা বোতাম ব্যাটারি অপসারণ করতে পারত। এটি ছোট ক্ষত নিরাময়ের কাজও করতে পারত। পরীক্ষাগুলো মূল ধারণার ব্যবহারিক চিকিৎসা প্রয়োগের প্রমাণ দেয়। যদিও অতীতে মূল রোবট কখনো বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে আসেনি। তা সত্ত্বেও এটি স্ব-একত্রিত বা সেলফ-অ্যাসেম্বলিং রোবোটিকসের অন্যতম প্রভাবশালী প্রদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে। ওরিগামি নীতির সঙ্গে স্মার্ট উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে গবেষকেরা দেখিয়েছেন জটিল রোবোটিক আচরণের জন্য সব সময় ভারী মোটর বা জটিল যান্ত্রিক সিস্টেমের প্রয়োজন হয় না।

সুইজারল্যান্ডের সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি জুরিখের রোবোটিকসের অধ্যাপক ব্র্যাডলি নেলসন বলেন, এই ধারণা অত্যন্ত সৃজনশীল এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। এটি একটি ক্লিনিক্যাল বা চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনকে খুব চমৎকার উপায়ে সমাধান করে। আমার দেখা ওরিগামি রোবটগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগ। এই প্রকল্প সফট রোবোটিকস, চিকিৎসা ডিভাইস এবং স্বায়ত্তশাসিতভাবে আকৃতি পরিবর্তন করতে সক্ষম প্রোগ্রামেবল উপাদানের গবেষণায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প খাতের জন্য বিজ্ঞানীরা রোবটগুলোকে আরও ছোট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমআইটির এই স্ব-ভাঁজ হওয়া ওরিগামি রোবটটি তার একটি প্রাথমিক প্রমাণ। এটি দেখায় কিছু পরিশীলিত মেশিন কেবল একটুকরা সমতল প্লাস্টিক হিসেবে জীবন শুরু করতে পারে। সঠিক তাপমাত্রার স্পর্শে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া