মানচিত্রে আফ্রিকার আকার ছোট করে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে
মানচিত্রে আফ্রিকার আকার ছোট করে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে

মানচিত্রে আকারে ছোট করে দেখানো হচ্ছে আফ্রিকাকে

বিশ্বকে আমরা যেভাবে দেখি, তা নির্ধারণ করে মানচিত্র। কিন্তু শত শত বছর ধরে প্রচলিত মানচিত্র মহাদেশগুলোর সঠিক রূপ তুলে ধরেনি। আফ্রিকার আকার ছোট করে দেখানোর প্রবণতা নিয়ে আছে তীব্র বিতর্ক। এই বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি নতুন প্রস্তাব পাস হয়েছে। সদস্যদেশগুলো বিপুল ভোটে এ প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেয়। সরকার, স্কুল ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ধরনের মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। যে মানচিত্রগুলোতে আফ্রিকার প্রকৃত আকার সঠিকভাবে ফুটে ওঠে, তা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ষোড়শ শতকের মারকেটর ধারণার বিরুদ্ধে আফ্রিকার দেশগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের এটি বড় সাফল্য।

ভোটের দিন জাতিসংঘের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডাফে। তিনি বলেন, ‘একটি ন্যায্য মানচিত্র বিশ্বের ভূগোল পরিবর্তন করে না। এটি বিশ্বকে দেখার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ভোটের লড়াইয়ে প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে ১৬৪ ভোট। বিপরীতে মাত্র একটি দেশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। যুক্তরাষ্ট্র একাই এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ওয়াশিংটন এ উদ্যোগকে একটি উগ্র মতাদর্শিক প্রকল্প বলে অভিহিত করে। এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থাকে।

নতুন এ প্রস্তাবের ফলে পুরোনো প্রচলিত মারকেটর মানচিত্র পুরোপুরি নিষিদ্ধ হচ্ছে না। কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে সম-আয়তনের মানচিত্র বা ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। স্কুল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই মানচিত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। সমতল মানচিত্রের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে বলা হয়েছে। ইউরোপীয় নাবিকদের সুবিধার জন্য ষোড়শ শতকের মানচিত্র এখন বেশ প্রচলিত। ফ্ল্যান্ডার্সের মানচিত্রকর গেরার্ডুস মারকেটর ১৫৬৯ সালে এটি তৈরি করেন। সোজা পথে দিকনির্ণয় করার জন্য এই মানচিত্র দারুণ কার্যকর ছিল। কিন্তু দিক ঠিক রাখতে গিয়ে এলাকার আয়তনে বড় ধরনের গরমিল ঘটে। বিষুবরেখা থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির আকার বাড়তে থাকে।

গ্রিনল্যান্ড আর আফ্রিকার আকার প্রায় সমান বলে এই মানচিত্রে মনে হয়। অথচ আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ১৪ গুণ বড়। উত্তর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেও একইভাবে অনেক বড় করে দেখানো হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিকৃত মানচিত্র মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি করেছে। আফ্রিকার প্রতীকী সংকোচন ঘটিয়ে বিশ্ব সম্পর্কে একটি ভারসাম্যহীন ধারণা দেওয়া হয়েছে।

আফ্রিকা ইউনিয়নের সমর্থনে এ আলোচনার নেতৃত্ব দেয় টোগো। এ ধরনের মানচিত্র সংশোধনকে জ্ঞানগত ন্যায়বিচার ও স্মারক ক্ষতিপূরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৮ সালে তৈরি ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন সঠিক অনুপাত তুলে ধরে। রবার্ট ডাফে জানান, ‘মারকেটর মানচিত্রের উপযোগিতাকে আমরা অস্বীকার করছি না।’ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন। মার্কিন প্রতিনিধি বলেন, এ প্রস্তাব জাতিসংঘের কাজের পরিহাস। কার্টোগ্রাফিক অনুপাত সংশোধনের নামে এটি একটি বড় মতাদর্শিক প্রকল্প। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ফ্রান্স সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ভোট শুরুর ঠিক আগে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাঁ-নোয়েল ব্যারো একটি ঘোষণা দেন। ফরাসি সরকার বিশ্ব মানচিত্র থেকে মারকেটর প্রজেকশন বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর আকারও তুলনামূলকভাবে ছোট দেখাবে।

ইউক্রেন এ উদ্যোগকে সমর্থন করলেও কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চল যেভাবে দেখানো হয়, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও একই বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে। সীমান্ত বা সার্বভৌমত্বের সঙ্গে এই মানচিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তারা স্পষ্ট করে।

পৃথিবী গোল হওয়ায় সমতল কাগজে তাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। প্রতিটি মানচিত্রে ক্ষেত্রফল আকার বা দূরত্বের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিতে হয়। যদিও জাতিসংঘের এই প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। মারকেটর মানচিত্র রাতারাতি হারিয়েও যাচ্ছে না। কিন্তু মানচিত্র নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্বকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পক্ষে এটি বড় পদক্ষেপ।

সূত্র: ইউএন নিউজ