
প্রায় দুই হাজার বছর আগে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে পুড়ে যাওয়া একটি প্যাপিরাস স্ক্রলের লেখা উদ্ধার করেছেন গবেষকেরা। স্ক্রল হলো একধরনের প্রাচীন কাগজের লম্বা টুকরা, যা গুটিয়ে রাখা হতো। স্ক্রলটি দীর্ঘদিন ধরে যেটিকে সম্পূর্ণ অপাঠ্য বলে মনে করা হচ্ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় সেই স্ক্রলের ভেতরের লেখা এবার পড়া সম্ভব হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্ক্রলটির কোনো অংশ খুলতে হয়নি; ভার্চ্যুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে এর ভেতরের লেখার পাঠ উদ্ধার করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ইতালির নেপলসের জাতীয় গ্রন্থাগারে এ সাফল্যের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইতালির গবেষকেরা। যে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে খ্রিষ্টীয় ৭৯ সালে হারকুলেনিয়াম নগরী ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, অনুষ্ঠানস্থল থেকে সেই আগ্নেয়গিরিও দেখা যাচ্ছিল। পিএইচইআরসি ১৬৬৭ নামে পরিচিত স্ক্রলটি থেকে ২০টি কলামজুড়ে প্রায় দেড় মিটার দীর্ঘ ধারাবাহিক গ্রিক লেখা উদ্ধার করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের পুড়ে যাওয়া স্ক্রল থেকে এত দীর্ঘ ও ধারাবাহিক পাঠ এর আগে কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
হারকুলেনিয়ামের সংগ্রহে থাকা প্রাচীনতম স্ক্রলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। গবেষকদের ধারণা, এটি খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক বা সম্ভবত তৃতীয় শতকের শেষভাগে লেখা হয়েছিল। বর্তমানে স্ক্রলটির অবশিষ্ট অংশের উচ্চতা মাত্র ৮ সেন্টিমিটার ও প্রস্থ ২ সেন্টিমিটার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খুলে খুলে পড়ার প্রচেষ্টার কারণে স্ক্রলটির বাইরের অনেক স্তর নষ্ট হয়ে গেছে।
১৭৮২ সালের নথিতে স্ক্রলটি চাপা পড়লেও মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি খোলার চেষ্টাই এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮০-এর দশকে স্ক্রলটির একটি অংশ খোলা হলেও তখন গবেষকেরা একে সম্পূর্ণ অপাঠ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন।
এই গবেষণার পেছনে রয়েছে ‘ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জ’ নামের একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রেন্ট সিলস প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ন্যাট ফ্রিডম্যান ও ড্যানিয়েল গ্রসের সহায়তায় ২০২৩ সালে এ উদ্যোগ শুরু করেন। তবে পুড়ে যাওয়া প্রাচীন স্ক্রল পাঠোদ্ধারের প্রযুক্তি নিয়ে তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। স্ক্রলটি পড়ার জন্য প্রথমে যুক্তরাজ্যের ডায়মন্ড লাইট সোর্স এবং ফ্রান্সের ইউরোপীয় সিনক্রোট্রন রেডিয়েশন ফ্যাসিলিটিতে উচ্চক্ষমতার মাইক্রো-সিটি স্ক্যান করা হয়। একটি স্ক্রলের স্ক্যান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের পরিমাণ ৩০০ টেরাবাইট পর্যন্ত পৌঁছায়, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডেটাসেট। এরপর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি এআই মডেল স্ক্রলের ভেতরে ব্যবহৃত কালির চিহ্ন শনাক্ত করে। পরে স্ক্রলের স্তরগুলো ভার্চ্যুয়ালি সমতল করে একে একে অক্ষর ও শব্দ পড়া সম্ভব হয়। প্যাপিরোলজিস্ট ফেদেরিকা নিকোলার্দি বলেন, ‘১৯৮০-এর দশকে স্ক্রলটির একটি অংশ খোলার পর একে সম্পূর্ণ অপাঠ্য বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে উন্মোচনের ফলে এখন আমরা একাধিক কলামজুড়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও যুক্তি অনুসরণ করতে পারছি। এটি এ গবেষণার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অগ্রগতি।’
উদ্ধার করা লেখায় নৈতিকতা, শিল্প ও মানুষের আচরণ নিয়ে স্টোইক দর্শনের আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি গবেষকদের বিস্মিত করেছে। কারণ, হারকুলেনিয়ামের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত অধিকাংশ রচনাই এপিকুরিয়ান দর্শনসংক্রান্ত। নিকোলার্দির গবেষণা দলের ধারণা, লেখাটি সম্ভবত স্টোইক দর্শনের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ ক্রিসিপাসের রচনা। কারণ, এতে তাঁর ভাতিজা ও শিষ্য অ্যারিস্টোক্রিয়নের নামের উল্লেখ পাওয়া গেছে। লেখায় ‘হরমে’ বা মানুষের অন্তর্গত তাড়না এবং ‘ফ্রোনেসিস’ বা বাস্তবজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। স্টোইক দর্শনে বাস্তবজ্ঞানকে মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্ক্রলের একটি অংশে লেখা রয়েছে, ‘আমরা কোনো বিষয়ের অনুসন্ধান করব, কিন্তু তা উপলব্ধি করতে পারব না, যদি আমরা নিজেদের এবং আমাদের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।’
এদিকে পিএইচইআরসি ১৩৯ নামের আরেকটি স্ক্রলে ‘ফিলোডেমাস, অন গডস, বই ৮’ বাক্যাংশের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গ্রন্থটি একটি নয়, অন্তত আটটি খণ্ডে রচিত হয়েছিল। এ ছাড়া পিএইচইআরসি ১৭২ নামের আরেকটি স্ক্রল থেকে ৭০টির বেশি কলাম উদ্ধার করেছেন গবেষকেরা। এটি ‘অন ভাইসেস, বই ১’ নামে একটি রচনা বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে হারকুলেনিয়ামের সংগ্রহে থাকা ৬০০টির বেশি স্ক্রল এখনো খোলা হয়নি। তাই আগামী জুনের মধ্যে এ ধরনের আরেকটি স্ক্রলের পূর্ণাঙ্গ পাঠ উদ্ধার করতে পারলে এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া