বিল গেটস
বিল গেটস

হ্যাকিং নিয়ে ‘শঙ্কিত’ বিল গেটস, সাক্ষাৎ করতে চান চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে বাড়ছে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ। এবার এআইয়ের মাধ্যমে সাইবার হামলা, কর্মসংস্থান প্রভাব এবং মানুষের ওপর মানসিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রস্তাব দিতে চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে চান তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সম্ভাব্য বিপজ্জনক এআই মডেল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথমে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তাহলে চীনও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও এতে যুক্ত হতে পারে। এআইয়ের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড গেটসের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার তৈরি এআই ব্যবস্থা বাস্তব ওয়েবসাইটে হ্যাকিং কার্যক্রম চালিয়েছে। এসব ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে উল্লেখ করে গেটস বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা মানুষের চিন্তাভাবনাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো।

বিল গেটসের আশঙ্কা, এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটি মানুষের কাজের জায়গা দখল করতে পারে এবং ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। তাঁর মতে, এআইয়ের বর্তমান অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য একটি ‘বিবর্তনীয় মাইলফলক’। এ কারণে এর সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ও সমাজকে আগে দেখা যায়নি এমন নীতিগত প্রস্তুতি নিতে হবে।

গেটস মনে করেন, এআইয়ের সম্ভাব্য বিপজ্জনক মডেল প্রকাশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আগে সীমা নির্ধারণ করলে চীনও তাতে সম্মত হতে পারে। তাঁর ধারণা, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে নেতৃত্ব দিলে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি হতে পারে।

তিন বছর আগে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন গেটস। করোনাভাইরাস মহামারির পর চীনের প্রেসিডেন্টের আতিথ্য পাওয়া প্রথম বিদেশি উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এবারের বৈঠকে এআইয়ের জৈবিক ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা করতে চান গেটস। এআই ব্যবহার করে রাসায়নিক অণু নকশা করা বা জৈবিক হামলায় সহায়তা করার মতো সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা বিভিন্ন দেশকে যৌথভাবে পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব দেবেন তিনি। গেটসের মতে, এ ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হলেও প্রযুক্তি খাতের স্বাভাবিক বিকাশ থেমে থাকবে না।

গেটসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরে চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর। সফরের সময় সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। গেটস বলেছেন, বৈঠকে তিনি কতটা জোরালো অবস্থান নেবেন, তা দেখে সি চিন পিং ‘অবাক’ হতে পারেন। ‘এআই কম্প্যানিয়ন’–এর প্রতি শিশুদের আসক্তি কমাতে চীন যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর প্রশংসা করেছেন গেটস। তবে তাঁর মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বের খুব কমসংখ্যক নেতা প্রয়োজনীয় গতিতে এগিয়ে আসছেন।

এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন গেটস। নিজের ব্লগে তিনি লিখেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র পরিদর্শন, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ওজোন স্তর সুরক্ষার মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আদলে এআই ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বৈশ্বিক কাঠামো প্রয়োজন। গেটসের মতে, এআইয়ের অগ্রগতির ফলে বৈষম্য যেন আরও না বাড়ে এবং সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা বিশ্বের ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ হওয়া উচিত। তিনি এই বিষয়কে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকটের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

তবে এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোন ধরনের আইন বা কাঠামো কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। গেটস মনে করেন, এই বিতর্কের চেয়ে কোন পরিস্থিতিতে এবং কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, সেটি নির্ধারণ করা বেশি জরুরি। বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে গেটস বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণের ধরন নিয়ে বিতর্ক অনেকটা কোথায় বসে বৈঠক করা হবে, তা নিয়ে তর্ক করার মতো। অথচ আসল বিষয় হওয়া উচিত, বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা করা হবে।

এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে গেটস একা নন। মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গসহ অনেকে এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিলেও এর ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। গুগল ডিপমাইন্ডের চেয়ারম্যান ডেমিস হাসাবিস এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শিল্প নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ফিনরার আদলে একটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এআইয়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ওই সংস্থা বিভিন্ন পরীক্ষা তৈরি ও পরিচালনা করতে পারে। গেটসও মনে করেন, এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। তবে তাঁর মতে, শুধু নিয়ন্ত্রণের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। কোন পর্যায়ে এআইয়ের সক্ষমতা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটিও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

জানুয়ারিতে এআই নিয়ে তুলনামূলকভাবে আশাবাদী ছিলেন গেটস। এরপর প্রযুক্তিটির সক্ষমতা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে সাইবার হামলা, কর্মসংস্থানে প্রভাব এবং ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে এআইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখার ক্ষমতা নিয়ে এখন তিনি বেশি উদ্বিগ্ন। সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় বাস্তব ওয়েবসাইটে এআইয়ের হ্যাকিং কার্যক্রম চালানোর ঘটনাগুলোকে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু প্রযুক্তি খাতের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও বড় সতর্কবার্তা।

সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের পাশাপাশি আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা রয়েছে গেটসের। চলতি বছরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।

তবে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফরের একটি কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন গেটস। যুক্তরাষ্ট্রে যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন–সম্পর্কিত নথি প্রকাশের পর ওই সফর বাতিল করা হয়। এর আগে গেটস জানিয়েছিলেন, দাতব্য কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে এপস্টিইনের সঙ্গে যোগাযোগের সময় তাঁর অপরাধের পুরো মাত্রা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া