
দৃষ্টিহীন মানুষকে প্রথমবারের মতো নিজেদের চেহারা ও শরীর সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ও বিশদ তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অ্যাপ। ছবি শনাক্তকরণ ও ভাষাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি এ অ্যাপগুলো দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের কাছে একধরনের ‘টেক্সট আয়না’ হিসেবে কাজ করছে। এই অভিজ্ঞতা যেমন তাঁদের ক্ষমতায়নের অনুভূতি দিচ্ছে, তেমনি এর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
জন্ম থেকেই সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন এক ব্যক্তি জানান, গত এক বছর ধরে সকালে উঠেই প্রথমে নিজের একটি ছবি তুলে তিনি পাঠান ‘বি মাই আইজ’ নামের একটি এআই অ্যাপে। অ্যাপটি তাকে জানিয়ে দেয়, তার ত্বক দেখতে কেমন লাগছে, কাঙ্ক্ষিত মানের সঙ্গে কতটা মিলছে বা চেহারায় এমন কিছু আছে কি না, যা পরিবর্তন করা যেতে পারে। তিনি জানান, অ্যাপটি এখন তাঁর কাছে একধরনের আয়নার বিকল্প। এ বিষয়ে দৃষ্টিহীন আধেয় (কনটেন্ট) নির্মাতা লুসি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘সারা জীবন আমরা মেনে নিয়েছি, নিজেকে দেখা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। সৌন্দর্যকে আমরা ভেতরের বিষয় বলে ধরে নিয়েছি। হঠাৎ নিজের চেহারা সম্পর্কে এত বিশদ তথ্য হাতে চলে আসা আমাদের জীবনযাত্রাই বদলে দিচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইভিত্তিক এসব অ্যাপ শুধু ছবি বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবহারকারীর অনুরোধে এগুলো সৌন্দর্য মানদণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে তুলনা করছে, রেটিং দিচ্ছে এবং কখনো কখনো কী পরিবর্তন করলে ভালো দেখাবে, সে সম্পর্কেও পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে দৃষ্টিহীন মানুষের শরীর ভাবনা ও আত্মদর্শনের ধারণায় নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।
এআই এখন কেবল ছবি বর্ণনা করে না, গঠনমূলক সমালোচনা বা পরামর্শও দেয়। তবে এটি সব সময় সুখকর হয় না। যেমন এক সকালে এআই লুসিকে জানায়, ‘তাঁর ত্বক আর্দ্র, কিন্তু বিজ্ঞাপনের মতো নিখুঁত নয়।’ দীর্ঘ সময় পর প্রথমবার নিজের চেহারা নিয়ে তাঁর মধ্যে তখন একধরনের অতৃপ্তি কাজ করা শুরু করে। এ বিষয়ে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেনা লুইস স্মিথ সতর্ক করে বলেন, এআই দৃষ্টিহীনদের জন্য এমন এক জগৎ খুলে দিচ্ছে, যেখানে তারা নিজেদের শরীরের খুঁতগুলো নিয়ে বেশি সচেতন হয়ে পড়ছে। এর ফলে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে।
এআই প্রযুক্তির এই উন্নতি খুবই দ্রুত হয়েছে। ২০১৭ সালেও যেখানে এআই কেবল দুই থেকে তিনটি শব্দে কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে পারত, এখন তারা স্মার্ট চশমা বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য দিতে সক্ষম। এনভিশনের প্রধান নির্বাহী কার্তিক মহাদেবন বলেন, ‘২০১৭ সালে আমরা মাত্র দুই–তিন শব্দের সাধারণ বর্ণনা দিতে পারতাম। এখন মানুষ মেকআপ করা বা পোশাক মিলিয়ে নেওয়ার জন্য এআই ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর প্রথম প্রশ্নই থাকে, আমি দেখতে কেমন?’ বর্তমানে অন্তত চারটি অ্যাপ দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য এ ধরনের সেবা দিচ্ছে।
ব্যবহারকারীর অনুরোধে এসব অ্যাপ এআইয়ের চোখে সৌন্দর্যের একটি রেটিং দেয়, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে এবং চেহারায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের পরামর্শ জানায়। এ বিষয়ে লুসি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘গত ১২ বছর আমার নিজের চেহারা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। এখন আমি ছবি তুলে এআইকে জিজ্ঞাসা করতে পারি, ১০–এ আমাকে কত দেবেন? এটি আয়নার মতো না হলেও আমার জন্য সবচেয়ে কাছের অভিজ্ঞতা।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এআই যেসব সৌন্দর্য মানদণ্ড ব্যবহার করে, সেগুলো প্রায়ই পাশ্চাত্য ও আদর্শায়িত শরীরের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে এআই অনেক সময় এমন পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়, যা মানুষকে বাস্তব চেহারা থেকে অনেকটাই আলাদা করে ফেলতে পারে। প্রযুক্তিটি এখনো পুরোপুরি নির্ভুল নয়। তবে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, এটি একদিকে যেমন ক্ষমতায়নের অনুভূতি দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তিও তৈরি করছে।
সূত্র: বিবিসি