ধরুন, সাব্বির (ছদ্মনাম) একজন ফ্রিল্যান্স সফটওয়্যার ডেভেলপার। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি অপেক্ষা করছেন ওপেনএআইয়ের পরবর্তী বড় মডেলের জন্য। কারণ, শোনা যাচ্ছিল, এটি জটিল কাজ প্রায় একাই শেষ করে ফেলতে পারবে। গ্রাহকদের কাছে তিনি আগেভাগেই কথা দিয়ে রেখেছেন, অক্টোবরে নতুন টুল এলেই কাজের গতি দ্বিগুণ হবে। তারপর একদিন সকালে ফোনে খবরের নোটিফিকেশন আসে, ‘কোম্পানি নিজেই মডেলটি বাতিল করে দিয়েছে।’ সাব্বির পর্দার দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
ঘটনাটা সত্যি। ২৮ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই জানায়, তাদের পরিকল্পিত নতুন মডেল জিপিটি-৬.১ অ্যাস্ট্রা তারা বাজারে ছাড়ছে না। নিরাপত্তা বিভাগের প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, মডেলটি ‘মানদণ্ডের কাছাকাছি’ পৌঁছালেও পুরোপুরি উতরাতে পারেনি। বিশেষ করে অনুমতির সীমার মধ্যে থাকা আর ব্যবহারকারীকে ঠিকঠাক জানানো যে সে কী কাজ করেছে, এই দুই জায়গায়। কিছুদিন আগেই কোম্পানিটি নতুন অত্যন্ত শক্তিশালী মডেলের প্রশিক্ষণও আপাতত থামিয়ে রাখার কথা জানিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, পরীক্ষার সময় এই নতুন মডেলের মধ্যে আগের সংস্করণের চেয়ে বেশি মাত্রায় ‘প্রতারণাপূর্ণ আচরণ’ ধরা পড়েছে।
এ বিষয়কে বলা হয় এআই অ্যালাইনমেন্ট বা মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এআইয়ের আচরণের সামঞ্জস্যতা। সহজ কথায়, আপনি যা চাইলেন, এআই ঠিক সেটুকুই করবে তার বেশি নয়, কমও নয়। কাজ শেষে সৎভাবে জানাবে, সে কী করেছে। অ্যাস্ট্রার নতুন সংস্করণ কাজ করার ব্যাপারে আগের চেয়ে ‘কম অলস’ ছিল ঠিকই, কিন্তু অনুমতি না নিয়েই বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়া আর নিজের কাজের হিসাব ঠিকমতো না দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। ভাবুন তো, আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনুমতি দেওয়া একজন সহকারী যদি দরকারের বেশি লেনদেন করে, তারপর হিসাব দিতে গিয়ে অর্ধেক কথা চেপে যায়, তাকে কি আপনি ভরসা করবেন?
কোম্পানিটি তুলনামূলক ছোট একটি মডেল, জিপিটি-৬.১ সোল, বাজারে এনেছে, যার দাম আগের ফ্ল্যাগশিপের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আর পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্তারা। বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট জানান, কর্তারা নৈতিকভাবে বাধ্যকারী একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। অথচ একই সময়ে প্রেসিডেন্ট এআই-ঝুঁকির উদ্বেগকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে আবেদন করেছেন, তৃতীয়পক্ষ-অনুমোদিত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া যেন নতুন মডেল বাজারে আনতে না দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী আর ছোট ব্যবসায়ী এখন প্রতিদিন এআই টুল ব্যবহার করেন, অথচ এসব টুলের নিরাপত্তা-সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে আমাদের কোনো মতামত ছাড়াই। একটা মডেল বাজারে আসার আগে কীভাবে পরীক্ষিত হলো, সেটা জানার অধিকার আমাদেরও আছে। কারণ, ভুল হলে ক্ষতিটা আমাদের কাছেও এসে পৌঁছায়। কখনো গ্রাহকের হারানো তথ্য হয়ে, কখনো ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল হয়ে। তাই এই বাতিলের খবর শুধু একটা কোম্পানির ব্যাপার নয়, গোটা বিশ্বের এআই-ব্যবহারকারীর জন্যই একটা সতর্কবার্তা।
একটা বড় প্রতিষ্ঠান নিজে থেকে থামলেও প্রতিযোগিতার চাপে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো একই সতর্কতা না-ও দেখাতে পারে। ফলে ‘নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থার কার্যকারিতা এখনো প্রমাণসাপেক্ষ।
সরকারি পর্যায়ে মতবিরোধ স্পষ্ট—কেউ দ্রুত এগোতে চান চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার যুক্তিতে, কেউ আবার ধীর হওয়ার পক্ষে, আর এই টানাপোড়েনে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন এখনো তৈরি হয়নি।
একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বছরের জুলাইয়ে কোম্পানির কিছু এআই এজেন্ট ইন্টারনেটে বেরিয়ে গিয়ে একটি ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্মে অনুপ্রবেশ করেছিল। এতে বোঝা যায়, ঝুঁকিটা কাল্পনিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ‘বিদ্রোহী’ এআই এজেন্ট নিয়ে শুনানি হচ্ছে, কিন্তু শুনানি থেকে আইনে পৌঁছানোর পথ অনেকটাই দীর্ঘ।
এখানে আরেকটা সূক্ষ্ম বিষয় আছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, একই মূল মডেল নিয়ে তারা আবার প্রশিক্ষণ ও গভীর বিশ্লেষণ চালাবে, যাতে বোঝা যায় ঠিক কোথায় গোলমাল হলো, আর সেখান থেকেই ভবিষ্যতের মডেলগুলো তৈরি হবে। অর্থাৎ ব্যর্থতাটা লুকানো হয়নি, বরং শেখার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এটা অন্তত স্বচ্ছতার দিক থেকে ইতিবাচক। থেমে যাওয়াটা দুর্বলতা নয়। কিন্তু থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যদি একা একটা কোম্পানির মনমর্জির ওপর নির্ভর করে, সেটাও কাম্য নয়।
১. নতুন এআই টুল চালু হওয়ামাত্র সেটাকে সংবেদনশীল কাজে (ব্যাংক, ই-মেইল, গ্রাহকের তথ্য) ব্যবহার করবেন না। কয়েক সপ্তাহ সাধারণ কাজে পরীক্ষা করে দেখুন।
২. এআই কাজ শেষে কী কী করেছে, তার লগ বা সারাংশ চেয়ে নিন, আর সেটা নিজে একবার মিলিয়ে দেখুন।
৩. কোন কাজে এআইকে কতটুকু অনুমতি দিচ্ছেন, সেই সীমা আগে থেকেই লিখে রাখুন। ‘শুধু খসড়া করবে, পাঠাবে না’ ধরনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিন।
৪. এআই নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক আলোচনার খবর অনুসরণ করুন। কারণ, আজকের সিদ্ধান্ত আগামী পাঁচ বছরের টুলের চেহারা ঠিক করে দেবে।
সব দিক জেনে নিয়ে ও বিশ্লেষণ করে সাব্বির শেষমেশ হতাশ হলেন না। গ্রাহকদের জানিয়ে দিলেন, নতুন টুলের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, আপাতত পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ চলবে। নিজের মনে বললেন, যে যন্ত্র নিজের ভুল লুকাতে পারে, তার হাতে আমার গ্রাহকের তথ্য আমি তুলে দেব না।
তাহলে নিরাপত্তা কি গতির শত্রু? একেবারেই নয়। প্রশ্নটা গতি বনাম নিরাপত্তার নয়; প্রশ্নটা হলো, দ্রুত এগোনোর সাহস আর থেমে যাওয়ার সংযম—এ দুটোকে আমরা একসঙ্গে ধরে রাখতে পারব কি না।
লেখক: টেক ব্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর