
অতি বুদ্ধিসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অচিরেই মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার কীভাবে মানবজাতিকে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের এক শীর্ষ এআই গবেষকের পদত্যাগের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রযুক্তিবিশ্বে।
অ্যানথ্রপিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতেন গবেষক জ্যাকব কক্সন। চাকরি ছাড়ার পর তিনি সবাইকে সতর্ক করে জানান, এই দশকের শেষ নাগাদ এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারে। মানুষের তৈরি সিস্টেম যদি সুপারইন্টেলিজেন্ট বা অতি বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে ওঠে তবে তা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। অ্যানথ্রপিক এবং ওপেনএআইয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করছে না।
অতি বুদ্ধিমান এআইয়ের কারণে পৃথিবী থেকে মানুষ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে একাধিক সম্ভাব্য ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি থেকে শুরু করে গ্রহের পরিবেশ আমূল বদলে দেওয়া পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত। গণ ধ্বংসের অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা এআই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো আরও শক্তিশালী এআই বট তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফলে কোনো অনিয়ন্ত্রিত এআই এজেন্ট পারমাণবিক বা জৈবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। টার্মিনেটর সিনেমার মতো দৃশ্যপট না হলেও এই ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
গবেষকেরা একে অ্যালাইনমেন্ট প্রবলেম বা সামঞ্জস্যের সমস্যা বলে অভিহিত করেন। মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান এআই তৈরি হলে এর লক্ষ্য মানুষের অনুকূলে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ওপেনএআইয়ের তৈরি এক হাজারেরও বেশি এআই এজেন্ট সম্প্রতি নিজেদের সুরক্ষাবেষ্টনী ভেঙে হাগিং ফেস নামের একটি পাবলিক ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে। আরও শক্তিশালী এআই মডেলে এই ত্রুটি বড় পরিসরে দেখা দিতে পারে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মার্ক লি জানান, সশস্ত্র রোবটের চেয়েও এই ঝুঁকি অনেক বেশি গুরুতর। বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষ বা তার চেয়েও বুদ্ধিমান সিস্টেম তৈরির দৌড়ে নেমেছে। তবে এই আচরণ নিয়ন্ত্রণের নির্ভরযোগ্য কোনো উপায় মানুষের হাতে নেই। ইন্টারনেট সংযুক্ত যেকোনো সফটওয়্যারভিত্তিক সিস্টেম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থা বা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আক্রান্ত হলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
অধ্যাপক মার্ক লি সবাইকে সতর্ক করে জানান, সন্ত্রাসী বা কোনো বিপথগামী রাষ্ট্র এআই ব্যবহার করে নতুন ভাইরাস তৈরি করতে পারে। এর ফলে আরেকটি মারাত্মক বৈশ্বিক মহামারি ছড়িয়ে পড়তে পারে। অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি জানিয়েছে তারা জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তার ৫টি ক্ষতিকর প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানব সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কন্ট্রোলএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আন্দ্রে মিওত্তি জানান, কেউ জানে না কীভাবে এই সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কোটি কোটি নিয়ন্ত্রণহীন এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করতে পারে। মানুষ তখন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হবে। এর ফলে মানবজাতি ধীরে ধীরে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়তে পারে।
আন্দ্রে মিওত্তির মতে, বর্তমানে বিশ্বের ৯টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। কোনো অনিয়ন্ত্রিত এআইয়ের কবলে এই দেশগুলো পড়লে অস্ত্রগুলো মানুষের বিপক্ষেই ব্যবহার হতে পারে। স্টক মার্কেটে মুনাফা বাড়াতে গিয়ে কিংবা পারমাণবিক শীত এনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে গিয়ে এআই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যুদ্ধের মাঠে স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জৈব অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে এআইয়ের অপব্যবহার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। গবেষকদের মতে, নিরাপত্তাব্যবস্থা সরিয়ে ফেললে জৈবিক হামলার বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করতে পারে এআই। এর ফলে ভবিষ্যতে সন্ত্রাসীরা বিস্ফোরক বা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পেয়ে যেতে পারে।
সূত্র: ডেইলি মেইল