গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন আজম খান
গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন আজম খান

জ্বালানি গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন বাংলাদেশি আজম খান

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অগ্রগতি পরিমাপ করা হতো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা, সঞ্চালন লাইন ও মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম, ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে এবং বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া জনগোষ্ঠীর হার পৌঁছেছে ৯৯ শতাংশের ওপরে। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা ভিন্ন। এখন প্রয়োজন এমন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি, যা বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস দিতে পারবে, অপচয় কমাবে এবং বড় কোনো দুর্ঘটনার আগেই অবকাঠামোর ত্রুটি শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। নতুন বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিকস ও জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষক আজম খান।

গবেষণা ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য আজম খান ‘বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরস্কার ২০২৬ (গবেষণা বিভাগ)’–এ ভূষিত হয়েছেন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই পুরস্কারের জন্য প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশকে নির্বাচিত করা হয়। গবেষণাজগতে তাঁর কাজের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হয় গুগল স্কলার প্রোফাইল থেকে। বর্তমানে তাঁর গবেষণাকর্ম ৩০৭টি সাইটেশন (উদ্ধৃতি) অর্জন করেছে। তাঁর এইচ–ইনডেক্স ১২ এবং আই ১০–ইনডেক্স ১৫। এ ছাড়া তাঁর ১৫টির বেশি পিয়ার–রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ, আইইইই সদস্যপদ এবং এআই সমন্বিত ডেটা প্রসেসিং ও সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তি–সংক্রান্ত একটি পেটেন্ট রয়েছে।

আজম খানের গবেষণার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল আইইইই ওপেন জার্নাল অব দ্য কম্পিউটার সোসাইটিতে প্রকাশিত তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা হলো—বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্তকরণে পদার্থবিজ্ঞান নির্দেশিত বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক। এ গবেষণায় তিনি পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক মডেল ও বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্ত করার একটি উন্নত এআই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে এই মডেল ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ভুলতা ও ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ রিকল অর্জন করেছে। এক্সপ্লেইনেবল এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি গিয়ারবক্সের তাপমাত্রা, ব্লেডের কম্পন ও জেনারেটরের টর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ত্রুটির কারণও ব্যাখ্যা করতে পারে। সহজ কথায়, বড় কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই এটি প্রকৌশলীদের সতর্কতা সংকেত পাঠাতে সক্ষম।

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ডেটাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে আজম খানের গবেষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানি ব্যবহারের ধরন অপ্টিমাইজ বা সর্বোত্তমকরণ: টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি এআই–চালিত পদক্ষেপ, যেখানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনার কৌশল দেখিয়েছেন। এই মডেল বাংলাদেশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বা সাভারের মতো ভারী শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, যা শক্তির অপচয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্পকারখানার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।

আজম খান

করপোরেট ও উৎপাদন খাতে সফল প্রয়োগ

আজম খান কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নন, বৈশ্বিক শিল্প খাতেও তাঁর কাজের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় হুন্দাই মোটর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উৎপাদন কার্যক্রমে অপারেশনস ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। সেখানে তিনি মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিকস ও শক্তি দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত প্রকল্পে কাজ করছেন। আজম খানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ডেটা সিস্টেম ও প্রেডিক মেইনটেন্যান্স, কার্বন–সচেতন এআই উন্নয়ন এবং ডেটা সেন্টারের মতো শক্তিশালী ও নিবিড় ডিজিটাল অবকাঠামোর জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি।

আজম খান হোয়াটসঅ্যাপে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। কোন সময় কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, কোথায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে কিংবা কোথায় অপচয় হচ্ছে—এসব সিদ্ধান্তও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব। তবে একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তিকেও আরও শক্তিশালী ও দক্ষ করে তুলতে হবে।’

একসময় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎকে আরও বুদ্ধিমান, দক্ষ ও টেকসই করা।

আজম খানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তিনি ইন্টারন্যাশনাল আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (লস অ্যাঞ্জেলেস) থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর আগে তিনি দেশের তৈরি পোশাক খাত ও হসপিটালিটি খাতেও ডেটা অ্যানালিটিকস নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি আইইইই ও অরকিড–এর সক্রিয় সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও টেকসই প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে এই বাংলাদেশি তরুণের অবদান দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—এআইয়ের মাধ্যমে ‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগুলোকে আরও শক্তিশালী ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা।