বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির (ডিজিটাল বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা) ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও অনলাইননির্ভর এ মুদ্রার ব্যবহার বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চেনালাইসিস ১১৭ দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘দ্য ২০২৬ জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো রিপোর্ট’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে ৫৬তম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ৬ষ্ঠ, পাকিস্তান ২৫তম ও শ্রীলঙ্কা ৮২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারের তালিকায় বাংলাদেশে অবস্থান ছিল ১৩তম।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সালের পর বিশ্বজুড়ে মন্দা কাটিয়ে উঠেছে ক্রিপ্টো অর্থনীতি। ক্রিপ্টোকারেন্সির মোট বাজারমূল্য (মার্কেট ক্যাপ) প্রায় ৫০ শতাংশ বা ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার হ্রাস পেলেও অন-চেইন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে হয়েছে। এ বছর সার্ভিস ফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার কার্যক্রম, আন্তসীমান্ত লেনদেন এবং অন-চেইন ব্যালেন্সের মতো চারটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টো ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল। ২৫২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের অর্থনীতি নিয়ে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় এই ক্রিপ্টো বাজার ইনডেক্সের প্রতিটি সূচকেই এগিয়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাব ধরে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এই সময়ে বিটকয়েন একই সঙ্গে সর্বোচ্চ দামের উচ্চতায় পৌঁছেছিল। আবার পরবর্তী সময়ে ডলারের মূল্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দরপতনের মুখোমুখি হয়েছিল, যার ফলে এর শীর্ষ অবস্থান থেকে দরপতন ঘটেছিল সর্বোচ্চ ৬৭ হাজার ডলার পর্যন্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টো অর্থনীতি (সার্ভিস ইনফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার কার্যক্রম এবং আন্তঃসীমান্ত স্থানান্তরের সমন্বয়) পূর্ববর্তী মেয়াদের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি, যেমন বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপল ও লাইটকয়েন বিভিন্ন কাজে লেনদেন করা হয়। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা ব্যক্তির সংখ্যা ৪৩ লাখ বলে দাবি করা হয়েছিল। ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাগুলো কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না। ফলে এসব মুদ্রার বিপরীতে কোনো আর্থিক দাবি স্বীকৃত নয়। এসব মুদ্রার লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমোদনও করে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেন বৈধ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে চেনালাইসিসের ইনডেক্স কোনো দেশের সরকারি বা আইনি স্বীকৃতি বিশ্লেষণ করে না। এই প্রতিবেদন বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ বা তৃণমূল পর্যায়ে কী পরিমাণ বাস্তব লেনদেন বা কার্যক্রম ঘটছে, তা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রিপ্টো ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে, যা এই প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে। এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের লেনদেনের পরিমাণকে কেবল মোট অঙ্কের হিসাব করা হয় না। হিসেবের সময় দেশের মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে পরিমাপ করা হয়। উন্নত দেশের তুলনায় একটি উন্নয়নশীল বা নিম্ন আয়ের দেশে যদি তুলনামূলক কম পরিমাণেও ক্রিপ্টো লেনদেন হয়, তবু মাথাপিছু তুলনার কারণে সেই দেশ সূচকে অনেক এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে এই সূচক তাই বেশ উঁচুতে অবস্থান করে। উন্নত বিশ্বের মানুষের কাছে ক্রিপ্টো হলো মূলত একটি বিকল্প বিনিয়োগ বা প্রযুক্তিগত সম্পদ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি অনেক সময় অর্থনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার উপায় হিসেবে কাজ করে। ফ্রিল্যান্সারদের পেমেন্ট গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিলতা এড়ানো কিংবা সহজে মূল্য স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রিপ্টো ও স্টেবলকয়েনের ব্যবহার বেড়েই চলেছে বলা যায়। আবার প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যাংকভিত্তিক চ্যানেল বন্ধ থাকলেও পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক, বিকেন্দ্রীকৃত এক্সচেঞ্জ বা অফিশিয়াল খাতের বাইরে থাকা বিভিন্ন উপায়ে মানুষ ক্রিপ্টোতে লেনদেন করে থাকে। মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে থাকা উদীয়মান বাজারে তৃণমূল স্তরে লেনদেন চলতে থাকে।
সূত্র: চেনালাইসিস