
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা সক্রিয়, তাঁদের কাছে ‘মিম’ শব্দটি খুবই পরিচিত। মিম হলো মূলত কোনো বিষয়ের হাস্যকর ছবি, ভিডিও বা লেখা, যা মানুষকে বিনোদন দিয়ে থাকে। মিমের মাধ্যমে হাস্যরসের পাশাপাশি ব্যঙ্গও করা হয়ে থাকে। আর তাই বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম হয়ে উঠেছে শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম।
এই মিমের উৎপত্তি কোথায় বা কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। মিম কেবল ইন্টারনেট যুগের সৃষ্টি নয়। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ শত শত বছর ধরে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মিম ব্যবহার করে আসছে। এটি মূলত সাংস্কৃতিক কথোপকথনের একটি মাধ্যম। মানুষ সচেতনভাবে বা অজান্তে নানা ধরনের মিমের সঙ্গে যুক্ত থাকে। নিউইয়র্ক টাইমস ক্রসওয়ার্ড পাজলে ১৯৪০–এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত মিম শব্দটি প্রায় ষাটবার ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালের ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে প্রথম মিম শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, মিম হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারা তথ্যের টুকরা। মানুষের একে অপরকে বারবার কিছু বলার বা ভেটকি দেওয়ার প্রবণতা থেকেই এর বিস্তার ঘটে। ফরাসি ভাষায় মেমে শব্দের অর্থ একই এবং গ্রিক শব্দ মিমৌমাই অর্থ অনুকরণ করা। ইন্টারনেটে মিম শব্দটি মাইক গডউইন ১৯৯৩ সালে প্রথম ব্যবহার করেন।
বিজ্ঞানী ডকিন্সের মতে, ‘আমাদের ধারণা, আদর্শ, সংস্কৃতি ও প্রথা নিজেরাই পুনরুৎপাদিত হয় নানাভাবে। অনেকটা ভাইরাসের মতো এসব অনুকরণ হয়। পরে তা শেয়ার ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। মিম বলতে আমরা বর্তমানে অনুভূতি, চিন্তা, ধারণা বা নিছক কৌতুকের দৃশ্যগত রূপকে বুঝি। এসব বিষয় অবশ্য কোনো না কোনো আকারে খ্রিষ্টপূর্ব তিন অব্দ থেকে দেখা গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রাচীন অ্যান্টিওক শহরের একটি স্থানে তিনটি ফ্রেমে বিভক্ত একটি মোজাইক আবিষ্কার করেছেন, যা দেখে মনে হয় একটি গোসলের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রথম ফ্রেমে একজন ভৃত্য গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছে; দ্বিতীয় ফ্রেমে এক তরুণ গোসল করা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং এক বয়স্ক ভৃত্য তাকে ধরার জন্য পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছে না।
শেষ দৃশ্যে আপাতদৃষ্টে আনন্দিত তরুণ বেপরোয়া কঙ্কাল এক জারের ওয়াইন সামনে অলস ভঙ্গিতে বসে রয়েছে। তার নিচের শিলালিপিতে খোদাই করা আছে, আনন্দ করো, জীবন উপভোগ করো। সেই গল্পের অন্তর্নিহিত বার্তাটি যেন এমন, আপনাকে কীভাবে বাঁচতে হবে, তা কাউকে বলতে দেবেন না! যা ইচ্ছা তা–ই করুন, কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে মরতেই হবে। বলা হয়, সেই মোজাইকের ছবি ইতিহাসের আদি ওয়াইওএলও। ইংরেজিতে ওয়াইওএলও বহুল ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ আপনি একবারই বাঁচবেন।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা কম্পিউটার চালাতে বা সিরির সঙ্গে কথা বলতে জানতেন না, কিন্তু তাঁদেরও নিজস্ব মিম ছিল, যা আজও সারা বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে কিলরয়ের ছবি দেখা যায়। তাঁর দীর্ঘ নাক ও বোঁচা বা মস্তকহীন অবয়ব অনেক জায়গাতেই দেখা যেত। এই ছবির উৎপত্তি নিয়ে নানা মিথ ও কিংবদন্তি থাকলেও সত্যি হলো, কিলরয় ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না। কিংবদন্তি বলে, এর উৎপত্তি জাহাজ পরিদর্শক জেমস কিলরয়ের মাধ্যমে, আবার অন্য একটি মতে ফ্রান্সিস কিলরয় নামের এক সেনা কর্মীর কথা বলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈনিকদের লড়াইয়ের সময় কিলরয় চিহ্ন বেশি জনপ্রিয় হয়। জার্মানিরা মনে করত, কিলরয় হয়তো কোনো আসল গুপ্তচর। তিনি সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। কিলরয় ছিলেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া এক মিম। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিমোর শিফম্যান ইন্টারনেট মিম নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল মিম অনন্য। কারণ, এগুলো কেবল একটি একক ধারণা নয়। এসব একে অপরের সম্পর্কে সচেতন থেকে তৈরি করা ধারণার একটি সমষ্টি। পেপে দ্য ফ্রগ–এর কথাই ধরা যাক। এই চরিত্র ফিলস গুড ম্যান নামের ডকুমেন্টারির তারকা। নিজে থেকে সে একটি সহজ–সরল ব্যাঙ, কিন্তু পেপের ছবি থেকে তৈরি মিম শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
ইন্টারনেট মিম সম্পর্কে শিফম্যান বলেন, এসব মিম সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ডিজিটাল কনটেন্টের একক। একে অপরের সচেতনতায় ব্যবহারকারীরা এসব তৈরি করেন। এসব অনেক ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে প্রচার করে। ব্যবহারকারীরাই নির্ধারণ করে দেন কোন মিম জনপ্রিয় হবে।
ইন্টারনেট মিমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়, তবে মিমের টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ। ড্যান্সিং বেবি নামের নাচের শিশুর মিম ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। অনেকেই একে প্রথম ডিজিটাল মিম বলে মনে করেন। এটি ডাউনলোড করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। ২০০০ সালের পরে ইন্টারনেটভিত্তিক চ্যাটরুমের জনপ্রিয়তা পেলে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মিম জনপ্রিয় হয়। ২০১০ সালের পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম, মাইক্রোভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পশ্চিমা–দুনিয়ার অনেক মিম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আবার এশিয়া অঞ্চলের অনেক বিখ্যাত ছবিও মিম আকারে প্রচার হতে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিমের অর্থের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক যুগে মিম হলো এমন একটি মিডিয়া, যা মূলত হাস্যরসের মাধ্যমে কোনো সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক বার্তা দেয়। এটি যেকোনো বিনোদনের মাধ্যমকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলতে সাহায্য করে থাকে। পপ–সংস্কৃতির নানা ঘটনা মিম তৈরির বড় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। ইন্টারনেটের যুগে মিম মানুষকে এক সুতায় বাঁধতে সাহায্য করে। খুব কম সময়ে সহজে বোধগম্য হওয়ার কারণে এগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনেক সময় মিম বেশ একচেটিয়া হয়ে থাকে। কারণ, কেবল নির্দিষ্ট বিষয় বা তার উৎস সম্পর্কে জানা ব্যক্তিরাই এর আসল অর্থ বুঝতে পারেন।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, পিবিএস