টিকটক অ্যাপ ব্যবহারকারীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। অ্যাপে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি সবার কাছে পরিচিতও। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভিডিও–ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি শুধু অ্যাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবহারকারী টিকটক ব্যবহার না করলেও ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তাঁর গতিবিধি অনুসরণ করতে পারে মাধ্যমটি। এমনকি কখনো টিকটকে অ্যাকাউন্ট না খোলা ব্যক্তিদের সম্পর্কেও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে টিকটকের কাছে ক্যানসার–সংক্রান্ত তথ্য, প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে অনুসন্ধান কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মতো ব্যক্তিগত বিষয় পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকটকের তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এখন একটি বিস্তৃত নজরদারি নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে এবং এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে ওয়েবজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। এর মধ্যেই টিকটকের নতুন কিছু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নজরদারির পরিধি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প–সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির পর নতুন করে গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারবিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীরা। যদিও টিকটকের দাবি, তথ্য চাওয়া হলে তারা স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করে এবং ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়।
এই নজরদারির মূল কেন্দ্র টিকটকের ‘পিক্সেল’। এটি একটি ট্র্যাকিং প্রযুক্তি, যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়েবসাইটে যুক্ত করে ব্যবহারকারীর অনলাইন আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। মূল উদ্দেশ্য বিজ্ঞাপন আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী প্রচারণা চালানো।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ডিসকানেক্ট’ টিকটকের হালনাগাদ পিক্সেল বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এটি প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা প্যাট্রিক জ্যাকসন একে ‘অত্যন্ত অনধিকারচর্চামূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন। একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, একজন সাংবাদিক ক্যানসার রোগীদের সহায়তা সংস্থার ওয়েবসাইটে একটি ফরম পূরণ করার সময় নিজেকে রোগী বা সুস্থ হওয়া ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করলে সেই তথ্য ই–মেইল ঠিকানাসহ টিকটকের কাছে পৌঁছে যায়।
টিকটকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার নীতিমালা ও নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এসব বিষয়ে জানানো হয় এবং প্রয়োজনীয় সেটিংসের মাধ্যমে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্র্যাকিং পিক্সেল নতুন নয়। গুগল, মেটাসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে ওয়েবজুড়ে ব্যবহারকারীদের কার্যক্রম অনুসরণ করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। পিক্সেল মূলত ওয়েব পেজের পেছনে থাকা একটি ক্ষুদ্র কোড, যা নীরবে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই ব্যবহারকারীর কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কে চলে যেতে পারে। টিকটক অ্যাকাউন্ট না থাকলেও নজরদারি থেকে মুক্ত থাকা কঠিন।
ডাকডাকগোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ওয়েবসাইটগুলোর প্রায় ৫ শতাংশে টিকটকের ট্র্যাকার রয়েছে। তুলনায় গুগলের ট্র্যাকার রয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ ওয়েবসাইটে এবং মেটার প্রায় ২১ শতাংশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য সংগ্রহ শুধু বিজ্ঞাপন নয়, ব্যক্তিগত আচরণ বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক প্রচারণা কিংবা মূল্যবৈষম্যের মতো ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। টিকটকের পিক্সেল বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হলেও সম্প্রতি এতে বড় পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের মালিকানা পরিবর্তনের দিন ব্যবহারকারীদের নতুন তথ্য সংগ্রহ নীতিমালায় সম্মতি দিতে হয়। এর আওতায় টিকটক একটি নতুন বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক চালু করেছে, যা অন্যান্য ওয়েবসাইটেও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে টিকটকের নজরদারি ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হতে পারে। ডিসকানেক্ট জানিয়েছে, নতুন পিক্সেল এমনভাবে কাজ করছে, যাতে ওয়েবসাইটগুলো গুগলে যে তথ্য পাঠায়, তার কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকটকের কাছেও পৌঁছে যেতে পারে। টিকটক অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বৌ গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ পদক্ষেপে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্রথমত, তুলনামূলক নিরাপদ ব্রাউজার ব্যবহার করা যেতে পারে। ডাকডাকগো কিংবা ব্রেভ ব্রাউজার গোপনীয়তা সুরক্ষায় বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়। ফায়ারফক্স ও সাফারিও তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প। দ্বিতীয়ত, ট্র্যাকার বন্ধে নির্ভরযোগ্য এক্সটেনশন ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন প্রাইভেসি ব্যাজার, ঘোস্টেরি কিংবা ইউব্লক অরিজিন। তবে অপরিচিত এক্সটেনশন ব্যবহার করলে উল্টো ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া একই ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন অনলাইন সেবায় ব্যবহার না করাও তথ্য সুরক্ষার একটি কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকটক নয়, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির পুরো ব্যবস্থাই এখন নজরদারি–নির্ভর হয়ে উঠছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শক্তিশালী গোপনীয়তা আইন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জরুরি। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘চেক মাই অ্যাডস’–এর কর্মকর্তা অ্যারিয়েল গার্সিয়া বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আইনগত চাপ তৈরি না হলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসবে না।
সূত্র: বিবিসি ডটকম