
ধরুন, মাঝরাতে ফোনে একটি ভিডিও এল। দেখা যাচ্ছে পরিচিত একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। ভিডিওটি এতটাই বাস্তব যে সন্দেহ করার সুযোগ নেই। আপনি ক্ষুব্ধ হলেন, শেয়ার করলেন, মন্তব্য করলেন। কয়েক ঘণ্টা পর জানা গেল ভিডিওটি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা আসলে কী দেখছি? আর কী বিশ্বাস করছি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু লেখা বা ছবি বানানোর সফটওয়্যার নয়। এটি এমন বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে পারে, যা চোখকে সহজেই ধোঁকা দেয়। এই প্রযুক্তিকে সাধারণভাবে ডিপফেক বলা হয়। কিন্তু সমস্যা শুধু প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা আমাদের অচেতন বিশ্বাসে।
ডিপফেক কীভাবে এত বিশ্বাসযোগ্য হয়
এআই বিপুল পরিমাণ ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠ বিশ্লেষণ করে মানুষের মুখভঙ্গি, চোখের নড়াচড়া, ঠোঁটের শব্দ মিলিয়ে নতুন ভিডিও তৈরি করতে পারে। আগে এমন কাজের জন্য বড় স্টুডিও দরকার হতো। এখন একটি কম্পিউটার আর সফটওয়্যারই যথেষ্ট। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি বা ইউটিউবের ভিডিও ক্লিপ কেউ ব্যবহার করে আপনারই একটি ভুয়া ভিডিও বানাতে পারে? প্রযুক্তিগতভাবে দিন দিন এমনটা সহজ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এআই উন্নয়নে কাজ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন ওপেনএআই। তারা নিরাপদ ও নীতিনির্ভর ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বললেও খোলা প্ল্যাটফর্ম ও অনিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপব্যবহার থামানো সহজ নয়। তাহলে দায় কার—প্রযুক্তির না ব্যবহারকারীর?
গুজবের আগুনে নতুন জ্বালানি
বাংলাদেশে গুজবের ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত। এখন একটি কৃত্রিম ছবি মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে যায়। ধরুন, কোনো ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ভুয়া ছবি ছড়ানো হলো। মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, উত্তেজনা বাড়ল। পরে জানা গেল ছবিটি অন্য দেশের পুরোনো ঘটনার কিংবা পুরোপুরি কৃত্রিমভাবে তৈরি। তখন প্রশ্ন হলো, ক্ষতিটা কি আর ফিরিয়ে আনা যায়? সামাজিক উত্তেজনা কি সহজে থামে? আমরা কি শেয়ার করার আগে একবারও ভাবি, উৎস কী? নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম কি খবরটি দিয়েছে? নাকি শুধু আবেগের বশে আঙুল পর্দায় ছুঁয়ে দিই?
কেন আমরা সহজে বিশ্বাস করি?
মানুষ চোখে দেখা বিষয়কে বেশি বিশ্বাস করে। একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। আর ভিডিও হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখন যদি ছবি নিজেই সত্য না হয়, আমরা কি এখনো আগের মতোই তা বিশ্বাস করি? আরেকটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। আমরা যে ধরনের কনটেন্টে বেশি প্রতিক্রিয়া দিই, সিস্টেম আমাদের সামনে সে রকম আরও কনটেন্ট আনে। ফলে আমরা একধরনের তথ্য বুদ্বুদের ভেতরে আটকে যাই। আপনি কি খেয়াল করেছেন, আপনার মতের সঙ্গে মেলে এমন খবরই বেশি চোখে পড়ে। আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে একমুখী তথ্যেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।
ভুয়া রাজনৈতিক ভিডিও হয়তো বড় আলোচনার বিষয়। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ।
একজন সাধারণ মানুষের ছবি ব্যবহার করে অশ্লীল বা আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা ব্ল্যাকমেলের শিকার হচ্ছে। পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। আপনার ছবি যে নিরাপদ, তা নিশ্চিত হওয়া যায় ন। আমরা প্রায়ই অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করি। কিন্তু সেগুলো কোথায় জমা হচ্ছে, কে ব্যবহার করছে, তার তো ঠিক–ঠিকানা নেই।
অর্থনৈতিক প্রতারণা বাড়ছে
কৃত্রিম কণ্ঠ নকল করে আত্মীয় সেজে টাকা চাওয়ার ঘটনা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে ঘটেছে। কল্পনা করুন, আপনার পরিবারের কারও কণ্ঠস্বরের মতো শোনাচ্ছে এমন একটি কল এল। বলা হলো জরুরি টাকা দরকার। আপনি সন্দেহ করবেন নাকি আবেগেই সিদ্ধান্ত নেবেন।
প্রযুক্তি যখন আবেগকে নকল করতে পারে, তখন প্রতারণা তো আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্বাসের ভাঙন। আগে বলা হতো ছবি মিথ্যা বলে না। এখন সেই কথাটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। যদি আসল ভিডিওকেও মানুষ ভুয়া বলে উড়িয়ে দেয়, তাহলে সত্য নিজেই দুর্বল হয়ে পড়বে। আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি, যেখানে সত্য প্রমাণ করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
প্রযুক্তিই কি সমাধান দেবে?
যে প্রযুক্তি ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করছে, সেটিই আবার শনাক্ত করার চেষ্টাও করছে। বিভিন্ন গবেষণা দল ভিডিওর পিক্সেলের অসামঞ্জস্য, আলোছায়ার অস্বাভাবিকতা, কণ্ঠের সূক্ষ্ম কম্পন বিশ্লেষণ করে ভুয়া কনটেন্ট ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দৌড়ে কে এগিয়ে থাকবে—নির্মাতা, না শনাক্তকারী?
আইন কতটা কার্যকর
বিভিন্ন দেশে ডিপফেক ও অনলাইন গুজব ঠেকাতে আইন প্রণয়ন হয়েছে। বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধ দমনে আইন রয়েছে। তবে প্রযুক্তি সীমান্ত মানে না। একটি ভিডিও এক দেশে বানিয়ে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায় মুহূর্তে। তখন বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। আইন থাকলেই সমস্যা সমাধান হয় না। নাগরিক সচেতনতাই বড় প্রতিরোধ।
আমরা কী করতে পারি?
প্রথম কাজ হলো থামা। কোনো উত্তেজনাকর ছবি বা ভিডিও দেখলে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার না করে একটু ভাবা। উৎস যাচাই করুন। নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে খুঁজুন। রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করুন। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের আবেগকে প্রশ্ন করুন। কেন এই কনটেন্ট আমাকে এত রাগান্বিত বা আতঙ্কিত করছে? কেউ কি ইচ্ছা করেই আমাকে প্রভাবিত করতে চাইছে? আমি কি অজান্তেই গুজবের বাহক হয়ে যাচ্ছি?
পরিবারে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সচেতনতা নিয়ে আলোচনা জরুরি। শিশু কিশোরদের শেখাতে হবে, ইন্টারনেটে দেখা সবকিছু সত্য নয়।
আপনি কি আপনার সন্তানকে এই শিক্ষা দিন।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেমে থাকবে না। প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে। ভবিষ্যতে লাইভ ভিডিও কলেও হয়তো ভুয়া মুখ ব্যবহার সম্ভব হবে।
তখন আমাদের প্রস্তুতি কতটা তা ভাবতে হবে।
প্রতিটি শেয়ার একটি সিদ্ধান্ত। প্রতিটি ক্লিক একটি অবস্থান। আমরা কি গুজবের বাহক হব, নাকি যাচাই করা তথ্যের দায়িত্বশীল নাগরিক হব—এটা বড় কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু সেই হাতিয়ার কার হাতে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। আজ যখন পর্দায় ভেসে ওঠা একটি ভিডিও মুহূর্তে আমাদের বিশ্বাস বদলে দিতে পারে, তখন সবচেয়ে জরুরি প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি।
তানজিম হাসান: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী