জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধারণ করা নেপচুন গ্রহের ছবি
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধারণ করা নেপচুন গ্রহের ছবি

নেপচুনে থাকা নিরিয়াড চাঁদের রহস্য উন্মোচনে নতুন তথ্য

মহাজাগতিক শূন্যতায় ঘেরা সৌরজগতের দূরবর্তী প্রান্তে লুকিয়ে আছে শত শত অমীমাংসিত রহস্য। আমাদের চেনা পৃথিবীর বাইরে সৌরজগতের অষ্টম এবং সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ নেপচুনকে ঘিরে থাকা চাঁদগুলোর ইতিহাস তেমনই রহস্যময়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পাঠানো সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নেপচুনের তৃতীয় বৃহত্তম চাঁদ ‘নিরিয়াড’ প্রাচীন এক মহাজাগতিক সংঘর্ষের একমাত্র অক্ষত সাক্ষী হতে পারে। কোটি কোটি বছর আগে একটি প্রলয়ংকরী সংঘর্ষের ঘটনায় নেপচুনের আদি উপগ্রহের পুরো দল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই মহাধ্বংসযজ্ঞ থেকে কেবল এই একটি চাঁদই অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় টিকে রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, সৌরজগতের অন্যান্য দূরবর্তী গ্রহের তুলনায় নেপচুনের উপগ্রহ–ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা এবং বেশ অদ্ভুত। বৃহস্পতি, শনি ও ইউরেনাসের মতো গ্রহগুলোর উপগ্রহ–ব্যবস্থা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। গ্রহগুলোর বড় বড় চাঁদ সাধারণত গ্রহের ঘূর্ণনের অভিমুখে একই দিকে প্রদক্ষিণ করে। নেপচুনের উপগ্রহের সংখ্যা কম হলেও সেগুলো কক্ষপথে বিশৃঙ্খল আচরণ করে। নেপচুনের সবচেয়ে বড় উপগ্রহের নাম ট্রাইটন। এটি নেপচুনের অন্য সব চাঁদের তুলনায় আকারে অনেক বেশি বড়। এই বিশাল চাঁদটি নেপচুনের ঘূর্ণনের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে উল্টো হয়ে প্রদক্ষিণ করছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পুরো সৌরজগতে ট্রাইটনই একমাত্র বড় উপগ্রহ, যা এমন উল্টো নিয়মে ঘোরে। ট্রাইটন মূলত নেপচুনের নিজস্ব কোনো উপগ্রহ নয়। এটি নেপচুনের চারপাশে তৈরি হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদটি সৌরজগতের একদম শেষ প্রান্ত বরফাবৃত বস্তুতে পূর্ণ আংটির মতো এলাকা কুইপার বেল্ট থেকে এসেছে। প্রায় ৪০০ কোটি বছরের আগে ট্রাইটন কোনোভাবে নেপচুনের কাছাকাছি চলে আসে। সেই সময়ে নেপচুনের শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ বল ট্রাইটনকে নিজের কক্ষপথে টেনে নেয়। নেপচুনের মহাকর্ষে বন্দী হওয়ার পর ট্রাইটন ধীরে ধীরে গ্রহটির ভেতরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই পথচলার সময়ে সেটি নেপচুনের আদি উপগ্রহগুলোর সঙ্গে মারাত্মক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রলয়ংকরী এই সংঘর্ষের কারণে নেপচুনের প্রাথমিক যুগের বহু উপগ্রহ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে।

নতুন এই গবেষণার তথ্যমতে, নিরিয়াড সম্ভবত ট্রাইটনের তৈরি করা সেই প্রাচীন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কোনোভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। এটি সম্পূর্ণ অক্ষত রয়ে গেছে। গবেষণার প্রধান লেখক এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্ল্যানেটারি সায়েন্সের শিক্ষার্থী ম্যাথিউ বেলিয়াকভ জানিয়েছেন, আমি বিশ্বাস করি, নিরিয়াড এই পুরো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র অক্ষত উপগ্রহ। নেপচুনের ভেতরের দিকে থাকা অন্যান্য চাঁদগুলোকে কোনোভাবেই পুরোপুরি অক্ষত বলা যায় না। ভয়েজার মহাকাশযানের পাঠানো ছবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ভেতরের চাঁদগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পাথরের স্তূপ বা স্রেফ ধ্বংসাবশেষ মাত্র। সেই চাঁদগুলো আদি উপগ্রহ ব্যবস্থার টিকে থাকা উপাদান হতে পারে, কিন্তু সেগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ বা সম্পূর্ণ চাঁদ নয়।

নতুন এই আবিষ্কার নিরিয়াডের উৎপত্তি বা জন্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগের সমস্ত ধারণা ও তত্ত্বকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। এত দিন বিশ্বাস করা হতো, নিরিয়াডও হয়তো ট্রাইটনের মতোই কুইপার বেল্ট থেকে আসা কোনো বহিরাগত বস্তু, যা পরে নেপচুনের মাধ্যাকর্ষণে আটকে পড়েছিল।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া নতুন তথ্য বিজ্ঞানীদের এই পুরোনো ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। নতুন ডেটা বা উপাত্তে দেখা গেছে যে নিরিয়াডের রাসায়নিক গঠন বা উপাদানের সঙ্গে কুইপার বেল্টের কোনো বস্তুর উপাদানের মিল নেই। এই নতুন তথ্য বিজ্ঞানীদের সামনে একটি বড় সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। নিরিয়াড আসলে নেপচুনের আদি উপগ্রহ–ব্যবস্থারই একটি অংশ ছিল, যা কোনো অলৌকিক উপায়ে ট্রাইটনের ধাক্কা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।

সূত্র: এনডিটিভি