নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে অনুপ কুমার রায়
নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে অনুপ কুমার রায়

টিউশনির টাকা জমিয়ে কম্পিউটার কেনা অনুপ এখন সফল ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা

অভাব–অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা শরীয়তপুরের তরুণ অনুপ কুমার রায় ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন সফল হওয়ার। আর তাই পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ তাঁকে অল্প বয়সেই করে তুলেছিল কঠোর পরিশ্রমী। একসময় যাঁকে প্রতিটি টাকা হিসাব করে খরচ করতে হতো, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করে সংসার ও পড়াশোনা চালাতে হতো, আজ তিনিই আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস (ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ দেওয়া-নেওয়ার ওয়েবসাইট) আপওয়ার্কের ‘টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার’। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলো থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মার্কিন ডলার বা কোটি টাকার বেশি আয় করেছেন তিনি। কাজের পরিধি বাড়ায় নিজ জেলায় ছোট একটি অফিসও চালু করেছেন অনুপ, যেখানে কাজ করছেন সাতজন কর্মী।

টিউশনির টাকায় প্রথম কম্পিউটার কেনা ও রাত জেগে শেখা

সফল ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অনুপ কুমার রায়ের সাফল্যের পথ কখনোই সহজ ছিল না। বাবা অসিত বরণ রায় ও মা পদ্মা রাণী রায়ের একমাত্র সন্তান অনুপ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে বান্দরবান জেলায়। ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাসের পর শরীয়তপুরের জাজিরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্স এবং পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি।

পড়াশোনার খরচ চালানো এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ২০১৬ সাল থেকে টিউশনি শুরু করেন অনুপ। পাশাপাশি একটি কোচিং সেন্টারেও দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ানো তাঁর কাছে শুধু আয়ের মাধ্যম ছিল না; এটি তাঁকে দায়িত্ব নিতে, সময়ের মূল্য বুঝতে এবং কঠিন পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

নিজের একটি কম্পিউটার কেনার স্বপ্ন থাকলেও বহুদিন তা পূরণ করতে পারেননি অনুপ। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার জন্য কম্পিউটার প্রয়োজন হলেও একসঙ্গে প্রায় ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে হাল ছেড়ে দেননি তিনি। টিউশনি করে পাওয়া টাকা থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা জমানোর পর বাকি ৩৫ হাজার টাকা মা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে কম্পিউটার কেনার পর খুশিতে অনুপের চোখে পানি চলে এসেছিল। কারণ, কম্পিউটারটি অনুপের কাছে শুধু একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছিল না; সেটি ছিল তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। কম্পিউটার কেনার পর টিউশনি করেই ধীরে ধীরে সব টাকা পরিশোধ করে দেন অনুপ।

ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর দীর্ঘ লড়াই

অনুপ কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘সফলতার পথটা এত মসৃণ ছিল না। শুরুতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিলেও ছয়-সাত মাস কেটে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। তবে সময় ও টাকা নষ্ট হওয়ার পরও আমি থেমে থাকেনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, শুধু কোর্স করলেই দক্ষ হওয়া যায় না, নিয়মিত অনুশীলন ও সমস্যা বুঝে সমাধান খোঁজাও জরুরি। এরপর শামীম হুসাইনের আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট “স্কিলআপার” থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি গুগলের বিভিন্ন অনলাইন কোর্স, ইউটিউব ও অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে রাত জেগে নিজে নিজে শেখা চালিয়ে যাই।’

অনুপ কুমার রায়

প্রথম ২০ ডলার আয়ের আনন্দ এবং মায়ের মুখের হাসি

প্রায় এক বছর চেষ্টার পর ২০২২ সালের জুনে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভআরে প্রথম পেইড মিডিয়ার কাজ করে ২০ ডলার আয় করেন অনুপ। আজকের দিনে অঙ্কটা ছোট মনে হলেও তাঁর কাছে এটি ছিল বিশাল এক অর্জন। প্রথম কাজের পর ফাইভারে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনুপ আপওয়ার্কে নিজের পেশাগত পরিচিতি গড়ে তোলেন এবং লিংকডইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বিস্তার করেন। ফ্রিল্যান্সিং থেকে নিয়মিত মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় আয় করার পর নিজের জন্য কিছু না কিনে আয়ের বড় অংশই মায়ের হাতে তুলে দিতেন তিনি। টাকা পাওয়ার আনন্দের চেয়ে মায়ের মুখে ফুটে ওঠা স্বস্তি ও হাসির ঝিলিকই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আজকের অনুপ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে

বর্তমানে ফাইভার ও আপওয়ার্ক—উভয় প্ল্যাটফর্মেই ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছেন অনুপ। তিনি মূলত পেইড মিডিয়া, গুগলের বিজ্ঞাপন পরিচালনা এবং কনভার্সন ট্র্যাকিং নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসা ও ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সির সঙ্গে কাজ করছেন। পাশাপাশি ইউরোপের একটি ফ্যাশন হাউসের মার্কেটিং ও বিজনেস ডেভেলপমেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

একা কাজ করার দিন পেরিয়ে এখন নিজ জেলা শরীয়তপুরে নিজের একটি ছোট অফিস চালু করেছেন অনুপ। সেখানে পেইড মিডিয়া পরিচালনা, সেলস ও মার্কেটিং, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে অনুপের মাসিক আয় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা হলেও এক মাসে সর্বোচ্চ ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন তিনি।

নতুনদের জন্য অনুপের বার্তা

নতুনদের উদ্দেশে অনুপ বলেন, ফ্রিল্যান্সিং রাতারাতি ধনী হওয়ার কোনো শর্টকাট পথ নয়; এটিকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে নিতে হবে। ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে অন্তত এক থেকে দেড় বছর নিয়মিত শেখা ও অনুশীলনের প্রস্তুতি থাকা জরুরি। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুগে কাজের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক এআই টুল ও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার শেখার ওপরও জোর দিতে হবে। সততা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।