
নেদারল্যান্ডসের একজন নাগরিক যখন একটিমাত্র ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সব সেবা গ্রহণ করেন, কিংবা ফিলিপাইনের কোনো উপকূলীয় গ্রামের মানুষ টাইফুন আঘাত হানার আগেই পূর্বাভাস পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে পারেন, তখন তা প্রযুক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেই আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। তবে দেশগুলোতে এই প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক কর্মযজ্ঞের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান।
নেদারল্যান্ডস থেকে ফিলিপাইন, নেপাল থেকে গাম্বিয়া ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে নানা ধরনের সরকারি সেবায় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে বাংলাদেশের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (অরেঞ্জবিডি)। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে কাজ করে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার যে স্বাক্ষর অরেঞ্জবিডি রেখে চলেছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য এক গর্বের অর্জন।
এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়নসহযোগীদের অর্থায়নে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো বা ‘গভটেক’ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে প্রযুক্তি সেবা প্রদানের মাধ্যমে তারা দেশে নিয়ে আসছে মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অরেঞ্জবিডির প্রযুক্তি সক্ষমতার প্রমাণস্বরূপ তারা ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে চারটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই সাফল্য কিন্তু রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দুই দশকের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা, মেধা, শ্রম, অভিজ্ঞতা এবং নতুন কিছু করে দেখানোর সাহস। ২০০৫ সালে নতুন প্রযুক্তি উদ্যোগ হিসেবে অরেঞ্জ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (অরেঞ্জবিডি) দেশের একাধিক শীর্ষ দৈনিক পত্রিকার অনলাইন ভার্সন, ই-পেপারের নিউজপেপার কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করে। সৃষ্টি হয় মুহূর্তে হালনাগাদযোগ্য, অনুসন্ধানযোগ্য ও সর্বক্ষণ প্রবেশযোগ্য এক নতুন সংবাদমাধ্যমের অভিজ্ঞতা।
সংবাদপত্রের এই ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে শুরু হয় সরকার, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ও নাগরিককেন্দ্রিক সেবাসমূহের ডিজিটাইজেশনের প্রক্রিয়া। সাফল্যের সঙ্গে দুই দশক পেরিয়ে সেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানটিই এখন বিশ্বের নানা দেশের সরকারি ডিজিটাল সেবা ও অবকাঠামো তৈরিতে কারিগরি ভূমিকা রাখছে। দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য উন্মোচন করেছে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
অরেঞ্জবিডির তথ্যমতে, নেদারল্যান্ডস সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরস্পর-সংযুক্ত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর একটি জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা এবং অন্যটি ইন্টারঅপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম। এই দুটি প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে নাগরিকেরা একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমেই বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি সিভিল, বিজনেস, ল্যান্ড, ট্যাক্সপেয়ার, অ্যাড্রেস ও বিজনেস লাইসেন্স—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি রেজিস্ট্রিকে আন্তসংযুক্ত করে ‘ওয়ান্স-অনলি’ নীতি বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে নাগরিকদের একই তথ্য বারবার জমা দিতে না হয়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্ম দুটি ২০২৭ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের অধীন পরিচালিত সরকারি প্রকল্প পর্যবেক্ষণের প্ল্যাটফর্ম ‘পিপিএমএস’, টাইফুন, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আগাম চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দিতে ‘প্রেডিক্টিভ টাইফুন অ্যানালিটিকস অ্যান্ড আর্লি অ্যালার্ট সিস্টেম’ এবং বাংসামোরো অঞ্চলের নাগরিক সেবা একত্রীকরণের ‘ডিজিটালবাংসামোরো পোর্টাল’সহ পাঁচটি উদ্যোগের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে তারা।
নেপালে ইউএনডিপির সহায়তায় সেই দেশের সরকারের জন্য একটি ডিজিটাল ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম’ গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অপুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পৃথক্করণ, উপাদান পুনরুদ্ধার কেন্দ্রের তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিলামপ্রক্রিয়া ডিজিটাইজ করা হয়েছে। দেশটির কয়েকটি পৌরসভায় ইতিমধ্যে সিস্টেমটি বাস্তবায়িতও হয়েছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তির সুফল পাচ্ছে নেপালের সাধারণ মানুষ।
আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ গভটেক রূপান্তরেরও কাজ করছে অরেঞ্জবিডি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, তাদের রয়েছে বিপুলসংখ্যক দেশি ও বিদেশি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, যাঁদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের নানা সরকারি সেবা ডিজিটাইজেশনেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এগুলোর মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগের তথ্য ডিজিটাইজেশন এবং অ্যাপোস্টিলের মতো সেবাব্যবস্থার বাস্তবায়নও অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া বিএসটিআইয়ের সনদ প্রদান প্রক্রিয়া ডিজিটাইজেশন, জাতীয় জাদুঘর, লালবাগ কেল্লা ও ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার ই-টিকিটিং ব্যবস্থা এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের নানা ডিজিটাল সেবা তারাই বাস্তবায়ন করেছে।
বিচার বিভাগের একাধিক আধুনিক সেবার নেপথ্যেও রয়েছে অরেঞ্জবিডি। বিশেষ করে করোনা মহামারির সংকটকালে ভার্চ্যুয়াল আদালতের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক জামিন আবেদন নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত হয়েছিল তাদের তৈরি ডিজিটাল অবকাঠামো। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট বৃত্তি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন ডিজিটাইজেশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে তারা।
অরেঞ্জবিডির পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম হোসেনের মতে, দেশে ও বিদেশে তাঁদের কাজের ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং নতুন উদ্ভাবনীকে সাদরে গ্রহণের মানসিকতা থেকে। অরেঞ্জবিডির কাজের ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি দেশীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক আয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
দেশের মাটিতে তৈরি অরেঞ্জবিডির কারিগরি এসব উদ্ভাবনী নেদারল্যান্ডস, ফিলিপাইন, নেপাল কিংবা গাম্বিয়ার নাগরিক সেবায় যখন কারিগরি সক্ষমতা হিসেবে যুক্ত হয়, তখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তা যেমন প্রযুক্তির ইতিবাচক রূপান্তরকে তুলে ধরে, তেমনি জাতি হিসেবে আমাদের জন্যও এক বিশাল গর্ব ও অর্জনের পরিচয় দেয়।