
পরিবার, সমাজ কিংবা জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারে না—যদি থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ। আমাদের সমাজে অনেক নারীই প্রতিনিয়ত নীরবে লড়াই করে যান। তেমনই এক সংগ্রামী নারী মিতু আক্তার। জীবনের নানা ঝড়ে যাঁর তরি প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু তিনি হার না মেনে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও সাহসিকতায় লিখেছেন এক নতুন বিজয়ের উপাখ্যান। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাননি, হয়ে উঠেছেন আরও ১০ জন তরুণ–তরুণীর অনুপ্রেরণা। তিনি এখন একজন সফল ফ্রিল্যান্সার।
নদীর তীরের শান্ত স্নিগ্ধ এক জনপদ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, আর সেখানকারই একটি চেনা গ্রাম বেজগাঁও। বাবা মো. আবুল হোসেন শেখ, পেশায় একজন সার্ভেয়ার বা আমিন। মানুষের জমির মাপজোখ আর হিসাব-নিকাশ করেই তাঁর সারা দিন কাটত। আর মা শিউলি বেগম ছিলেন পুরো পরিবারের মায়াবী ছায়া। মিতু আক্তারের ভাই-বোন মিলিয়ে মোট চারজন—তিন ভাই আর সবার ছোট একমাত্র বোন মিতু আক্তার। ভাই-বোনদের আদুরে স্নেহে আর মা-বাবার ছায়ায় এভাবেই কেটেছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোর। সময়ের পালাবদলে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর কোলজুড়ে আসে এক নতুন আলো—একমাত্র পুত্রসন্তান, সাফাত নূর আলিফ।
২০১৯ সালের দিকে মিতুর ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ঝড় বয়ে যায়। পারিবারিক টানাপোড়েন এবং একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। কোলে তখন মাত্র ছয় মাসের ছেল। উচ্চশিক্ষার সনদ না থাকা এবং পরিবারের পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় নিজের ও সন্তানের দায়িত্ব নিতে তাঁকে একাই লড়তে হয়; সইতে হয় নানা সামাজিক কটু কথাও।
২০১৯ সালের দিকে মিতুর ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ঝড় বয়ে যায়। পারিবারিক টানাপোড়েন এবং একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। কোলে তখন মাত্র ছয় মাসের ছেলে। উচ্চশিক্ষার সনদ না থাকা এবং পরিবারের পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় নিজের ও সন্তানের দায়িত্ব নিতে তাঁকে একাই লড়তে হয়; সইতে হয় নানা সামাজিক কটুকথাও।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদে তিনি ইন্টারনেটে সম্মানজনক কাজের খোঁজ শুরু করেন—যে কাজ ঘরে বসেই তাঁকে আর্থিক সচ্ছলতা ও আত্মমর্যাদা এনে দেবে। ২০২০ সালের শেষের দিকে ভাইয়ের একটি পুরোনো ভাঙা ল্যাপটপ খুব অনুরোধ করে নেন। সেই ল্যাপটপটি অনেক কষ্টে মেরামত করে তিনি গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করেন। কিন্তু বিচ্ছেদের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে আনার পথে ল্যাপটপটি আবার ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। মিতু আবারও গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন।
মিতু আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মাকে বোঝালাম যে আমাকে কোনোভাবে টাকার ব্যবস্থা করে দিলে আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করব। মা আমার কথায় কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের কানের দুল বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো।’ সেদিন আমার মা-ই আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।’
পরবর্তী সময়ে আগ্রহের জায়গা থেকে এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। দক্ষতা শাণিত করতে ভর্তি হন ক্রিয়েটিভ আইটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। নানা প্রতিকূলতা, ল্যাপটপের ত্রুটি এবং চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি।
কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরে তিনি আউটসোর্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে প্রথম ১২০ ডলারের কাজ পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এরপর মিতু ফাইভআরে লেভেল ২, আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হয়ে যান।
কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরে তিনি আউটসোর্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে প্রথম ১২০ ডলারের কাজ পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এরপর মিতু ফাইভআরে লেভেল ২, আপওয়র্য়াকে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হয়ে যান।
একপর্যায়ে তিনি একজন অংশীদার নিয়ে দল গঠন করে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে তাঁর এজেন্সিতে প্রায় ১০ জন তরুণ-তরুণী দূর থেকে বা রিমোটলি কাজ করছেন। ফাইভআরের পাশাপাশি সরাসরি গ্রাহক যোগাযোগ, এসইও এবং গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমে তাঁদের এজেন্সি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। শূন্য থেকে শুরু করে তিনি আজ নিজের পেশা গড়ার পাশাপাশি অন্য তরুণদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
সংসার আর সন্তানের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনার অসম্পূর্ণ অধ্যায়টা ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন মিতু আক্তার। অবশেষে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। শুধু এসএসসিতেই থেমে থাকেননি; বর্তমানে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতক (বিবিএ) করছেন তিনি।
মিতু আক্তার বলেন, ‘আমার জীবনসংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে মনের জোর আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা পেরিয়েই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। আমি কেবল নিজের জীবনের অন্ধকারই দূর করিনি, সমাজের নানা ভ্রান্ত ধারণাকে উপেক্ষা করে নিজের পথ তৈরি করেছি। মায়ের বিক্রি করে দেওয়া সেই কানের দুল আমি নিজের আয়ে আবার গড়ে দিয়েছি। একে একে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করছি; নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে একটি স্কুটিও কিনেছি।’
মিতু আক্তার আরও বলেন, ‘জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমি নিজেই নিজের ঠিকানা গড়েছি। একসময় কাজের সূত্রে প্রতারণার শিকার হয়েছিলাম, চারপাশের সবাই যখন বলেছিল ‘তুমি পারবে না’, ঠিক তখনই নিজের ভেতরের শক্তিকে খুঁজে পেয়েছি। আজ আমার একমাত্র সন্তান সম্পূর্ণ আমার জিম্মায় এবং তার সব দায়িত্ব এখন আমার নিজের কাঁধে। আমি প্রমাণ করে দিয়েছি যে পর্দা কোনো বাধা নয়, পর্দা রক্ষা করেও সফলভাবে কাজ করা যায়। ডিভোর্সের পর থেকে আমি বাবার বাড়িতে উঠিনি। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে নিজে বাসা ভাড়া নিয়ে ছেলেকে নিয়ে আলাদা থেকেছি। হাল ছেড়ে না দিয়ে নিজে গাড়ি চালানো শিখেছি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও সংগ্রহ করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে নিজের জমানো টাকায় জমি কিনেছি এবং খুব শিগগিরই নিজের বাড়ি বানানোর কাজও শুরু করতে যাচ্ছি। আজ আমার সব স্বপ্ন একে একে পূরণ হচ্ছে, আর যারা একদিন বলত ‘পারবে না’, আজ তারাই বাহবা দেয়। তবে আমি মেয়েদের বলব কেউই সবকিছু জেনে জন্মগ্রহণ করে না। সময় ও অনুশীলনের মাধ্যমে যে কেউ শিখতে পারে।
বর্তমান সময়ে অনলাইন ব্যবসা, পণ্য বা সেবার প্রচার এবং ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরিতে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ভূমিকা অপরিসীম বলে মনে করেন মিতু আক্তার। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার শিখে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের পেশাগতভাবে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারেন। তবে যেকোনো নতুন বিষয় আয়ত্ত করার জন্য প্রয়োজন প্রবল ধৈর্য, আগ্রহ ও ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল শেখা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করা খুবই জরুরি। আমার এই শেখার বিষয়ে বিশেষভাবে অবদান রেখেছে ক্রিয়েটিভ আইটি, আমার যেমন শেখার আগ্রহ ছিল তাদের ছিল শেখানোর। আমি আসলেই আমার এই অর্জনের পিছনের সত্যটা বললাম।’
আমার জীবনসংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে মনের জোর আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা পেরিয়েই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। আমি কেবল নিজের জীবনের অন্ধকারই দূর করিনি, সমাজের নানা ভ্রান্ত ধারণাকে উপেক্ষা করে নিজের পথ তৈরি করেছি। মায়ের বিক্রি করে দেওয়া সেই কানের দুল আমি নিজের আয়ে আবার গড়ে দিয়েছি। একে একে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করছি; নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে একটি স্কুটিও কিনেছি।
নিজের জীবনের এই কঠিন পথচলা মিতুকে নতুন এক লক্ষ্য দেখিয়েছে। তিনি এখন কেবল নিজের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না; বরং যেসব নারী সামাজিক বা পারিবারিক বাধার কারণে পিছিয়ে আছেন, তাঁদের নিয়ে কাজ করতে চান। বিশেষ করে যেসব নারী নিজের মতামত প্রকাশে কিংবা বাইরে কাজ করতে দ্বিধাবোধ করেন, তাঁদের মৌলিক ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। তাঁর মূল লক্ষ্য, আরও বেশি নারীকে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী করে তোলা।