মুহাইমিনুল ইসলাম
মুহাইমিনুল ইসলাম

সৈনিক থেকে সফল ফ্রিল্যান্সার মুহাইমিনুল, মাসে আয় ৩ লাখ টাকা

জীবন কখনো কখনো এমন এক বাঁক নেয়, যা কল্পনার চেয়েও সুন্দর। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের এক সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের গল্পটাও ঠিক সে রকম। একসময় যাঁর পরিবারের একমাত্র সম্বল ছিল ১৬ হাজার টাকার সরকারি চাকরি, আজ তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের বৈশ্বিক বাজারে এক সফল নাম। কম্পিউটার অন-অফ করতে না জানা সেই তরুণ আজ ফ্রিল্যান্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট (অনলাইন মার্কেটপ্লেস) আপওয়ার্কের ‘টপ রেটেড প্লাস’ ফ্রিল্যান্সার, আড়াই বছরে যাঁর মোট আয় প্রায় এক লাখ ডলার—বাংলাদেশি টাকায় যা কোটির ঘর ছুঁয়েছে! অদম্য ইচ্ছা, জীবনসঙ্গীর নিঃশর্ত সমর্থন আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্যবদলের এই অবিশ্বাস্য গল্পটি ফ্রিল্যান্সার মুহাইমিনুল ইসলাম।

ভাঙা স্বপ্নের শৈশব ও সেনাজীবনের শুরু

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের এ সি লাহা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোন মুহাইমিনুল ইসলাম। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। বাবা মৃত মো. সোহরাব হোসেন পাহলান ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মা কহিনুর বেগম গৃহিণী। শৈশবে আঁকাআঁকি আর ক্রিকেটের প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। পরবর্তী সময়ে খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তি হয়ে স্বপ্ন বুনেছিলেন প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্তের রূঢ় বাস্তবতায় সেই স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই থমকে যায়।

২০১৮ সালে পলিটেকনিকের চতুর্থ সেমিস্টারে থাকাকালীন পরিবারের হাল ধরতে দাঁড়িয়ে যান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাঠে। প্রথমবারেই চাকরিটা হয়ে যায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে ১ হাজার ১৫২ জনের মধ্যে ১৬তম হন। ২০২০ সালে ইউনিটে যোগ দেন। কর্মস্থল ছিল বগুড়া। কিন্তু বাঁধাধরা জীবনের এই চেনা ছক বেশি দিন তাঁর মনকে টানেনি। চাকরি ছাড়ার দুঃসাহস করেন এবং ছেড়ে দেন।

যখন সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন মুহাইমিনুল

জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২২ সালের শেষভাগ। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ১৬ হাজার টাকা বেতনের নিশ্চিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন মুহাইমিনুল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের এমন সিদ্ধান্তে আকাশ ভেঙে পড়ে স্বজনদের মাথায়। সবাই হতবাক, চারদিকে ঘোর অনিশ্চয়তা। কিন্তু তাঁর এই জেদ আর সাহসের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তির দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান।

মুহাইমিনুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন আমার স্ত্রী ইসরাত যদি রাজি না হতো, তবে আজকের এই গল্পটা হয়তো কোনো দিনই বলা হতো না।’ কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই বাড়িতে ফিরে আসেন। ভেবেছিলেন পড়ালেখা তো মাধ্যমিক পর্যন্তই শেষ করতে পেরেছেন, প্রয়োজনে কোনো হোটেলে কাজ করে হলেও জীবন চালাবেন, তবু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জীবন কাটাবেন না।

শূন্য থেকে শুরু: কপি-পেস্ট থেকে ওয়েব ডিজাইন

বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর এক দুলাভাইয়ের মাধ্যমে প্রথম জানতে পারেন ‘ফ্রিল্যান্সিং’ শব্দটার কথা। কম্পিউটার সম্পর্কে জ্ঞান তখন একেবারেই শূন্য, এমনকি পাওয়ার বাটন চেপে কম্পিউটার কীভাবে অন করতে হয়, তা–ও জানা ছিল না। কিন্তু মনে ছিল আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাস—‘মানুষ পারলে আমি কেন পারব না?’

সেনাবাহিনীর চার বছরের চাকরির জমানো টাকা দিয়ে একটা পুরোনো ল্যাপটপ কেনেন। ইউটিউব দেখে শেখেন কম্পিউটার অন-অফ করা আর কপি-পেস্টের প্রাথমিক কাজ। এরপর সেই দুলাভাইয়ের পরামর্শে তাঁর কাজে সাহায্য করার পাশাপাশি নিজে নিজে শিখতে শুরু করেন ওয়েব ডিজাইন।

এসইও টার্নিং পয়েন্ট

প্রায় এক বছর নানা কাজ শেখার পর ২০২৩ সালের দিকে ‘এসইও’ তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে পুরোদমে নিজের কাজ শুরু করেন আন্তর্জাতিক বাজারে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একাগ্রতার জোরে ২০২৫ সালের মধ্যেই আপওয়ার্কে অর্জন করেন সম্মানজনক ‘টপ রেটেড’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘টপ রেটেড প্লাস’ ব্যাজ। একই সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নামকরা মার্কেটিং এজেন্সিতে ‘এসইও স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে।
বর্তমানে আপওয়ার্ক থেকে তাঁর আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার এবং আড়াই বছরের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় ছুঁয়েছে প্রায় ১ লাখ ডলার (প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা)।

ফ্লাস্ক এসইও দলের সদস্যরা

এক অপূরণীয় ক্ষতি ও আগামী দিনের প্রত্যয়

সাফল্যের এই আলোঝলমলে দিনগুলো যখন কেবল ধরা দিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই মুহাইমিনুলের জীবনে নেমে আসে এক চরম অন্ধকার। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মারা যান তাঁর প্রিয় বাবা মো. সোহরাব হোসেন পাহলান। ছেলের এই অবিশ্বাস্য সাফল্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বাবা পুরোপুরি দেখে যেতে না পারলেও মুহাইমিনুল তাঁর বাবার স্বপ্নকেই এখন বাঁচিয়ে রাখতে চান। শুরুতে অসম্মতি জানালেও পরবর্তী সময়ে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া মা, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
যে তরুণ একদিন ১৬ হাজার টাকা বেতনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আজ তাঁর মাসিক আয় তিন লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি শুধু একাই চলছেন না, নিজের কাছের কিছু বন্ধু ও ছোট ভাইদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী দল। নাম দিয়েছেন ফ্লাস্ক এসইও। এই দল নিয়েই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরও বড় কিছু করার পরিকল্পনা করছেন মোরেলগঞ্জের মোহাইমিনুল ইসলাম।