
প্রযুক্তিবিশ্বে কয়েক মাস ধরে চলা নানা গুঞ্জন ও জল্পনা–কল্পনা সত্যি প্রমাণ করে নিজেদের তৈরি প্রথম ভাঁজযোগ্য বা ফোল্ডেবল আইফোন ‘আইফোন ডুও’সহ ‘আইফোন ১৮ প্রো’,‘আইফোন১৮ প্রো ম্যাক্স’ ও ‘এয়ারপডস ৫’ বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে অ্যাপল। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ অনুষ্ঠানে নতুন মডেলের আইফোনগুলো প্রদর্শনের পাশাপাশি সেগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরেন অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাসসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। অ্যাপলের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুকের উপস্থিতিতে ঘোষণা করা পণ্যগুলোর মডেল ও দাম জেনে নেওয়া যাক।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে অ্যাপল সিইও জন টার্নাস প্রতিষ্ঠানটির তৈরি প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন ‘আইফোন ডুও’ উন্মোচন করেন। তিনি জানান, আইফোন ডুও নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী অ্যাপল। খোলা অবস্থায় আইফোন ডুওতে ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চি পর্দা ব্যবহার করা যাবে। ফলে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পাতলা আইফোন। ভাঁজ করা অবস্থায় এর বাইরের পর্দার আকার ৫ দশমিক ৪ ইঞ্চি, যা আইফোন ১৮ প্রোর পর্দার প্রায় ৯০ শতাংশ জায়গা ব্যবহার করে।
অ্যাপলের তথ্যমতে, ভাঁজযোগ্য আইফোনটির দুই পর্দার আকৃতির অনুপাত একই রাখা হয়েছে। ফলে ফোন খোলা বা বন্ধ করা হলেও পর্দায় আধেয়ের (কনটেন্ট) আকার স্বচ্ছন্দে দেখা যাবে। ফোনটির পর্দায় ন্যানো টেক্সচার ফিনিশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আলোর প্রতিফলন কমানোর পাশাপাশি ভাঁজের দাগও তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হবে। ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি প্রায় একটি পাসপোর্টের আকারের। এতে গোলাকার কোণ ও একটানা ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ফোনটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়।
আইফোন ডুওতে ব্যবহার করা হয়েছে এ২০ প্রো চিপ। ফোনটিতে দুটি ব্যাটারি রয়েছে, যা একসঙ্গে কাজ করে। অ্যাপলের দাবি, শুধু বাইরের পর্দা ব্যবহার করেও একবার চার্জে সর্বোচ্চ ৪৪ ঘণ্টা ভিডিও দেখা যাবে। ভাঁজযোগ্য নকশার কারণে ফোনটির ক্যামেরায়ও নতুন কিছু সুবিধা যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘স্মার্ট টেক’ নামের সুবিধা অন্যতম। ‘ডুও ফেসটাইম’ নামের আরেকটি সুবিধার মাধ্যমে ফেসটাইম ভিডিও কলে কাছাকাছি থাকা অন্য একজনকেও যুক্ত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ফোনের বাইরের পর্দা ও ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে।
আইফোন ডুওর জন্য আইওএস ২৭ অপারেটিং সিস্টেমেও বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পর্দার উল্লম্ব জায়গা বেশি ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রণ সুবিধাগুলো পাশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘স্প্লিট ভিউ’ নামের নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে আইফোনে প্রথমবারের মতো একই সময়ে পাশাপাশি দুটি অ্যাপ চালানো যাবে। আইফোন ডুও পাওয়া যাবে ‘স্টার হোয়াইট’ ও ‘নাইট স্কাই’ রঙে। ফোনটির দাম শুরু হবে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে আগাম ফরমাশ কার্যক্রম শুরু হবে এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে ২৩ অক্টোবর থেকে পাওয়া যাবে ফোনটি।
নতুন প্রো সিরিজের আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্নত ‘ক্যামেরা ব্যবস্থা’ রয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যাপল। ফোনগুলোর মূল ক্যামেরায় ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন ক্যামেরা সেন্সর ব্যবহারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার–সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
অ্যাপলের তথ্যমতে, ক্যামেরার ছয়টি ‘লেজার-কাট ব্লেড’ চারটি ভিন্ন অ্যাপারচার সেটিংয়ের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে ছবির ডেপথ অব ফিল্ড ও আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। নতুন সেন্সরের কারণে কম আলোতে ছবি তোলার মানও উন্নত হবে। একই সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির ছবি তোলার সময়ও আরও বিস্তারিত ছবি পাওয়া যাবে।
আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে ‘অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ’ নামে নতুন একটি সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্যামেরার সেন্সর থেকে সংগৃহীত স্বাক্ষরযুক্ত তথ্য অ্যাপলের ‘প্রাইভেট ক্লাউড কম্পিউট’ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে মূল ছবির পাশাপাশি একটি আনঅল্টারেবল রেফারেন্স ছবি তৈরি করা হবে। সহজভাবে বললে, এটি অনেকটা ডিজিটাল নেগেটিভের মতো কাজ করবে। ফলে ছবিটি তোলার সময় মূল দৃশ্যে কী ছিল এবং পরে ছবিতে কী ধরনের সম্পাদনা করা হয়েছে, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
দুই মডেলেই রয়েছে নতুন এ২০ প্রো চিপ। দুই ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি এই চিপে ছয় কোরের সিপিইউ, সাত কোরের জিপিইউ এবং ১৬ কোরের নিউরাল ইঞ্জিন রয়েছে। অ্যাপলের দাবি, আগের এ১৯ প্রো চিপের তুলনায় নতুন চিপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়েছে। ডায়নামিক আইল্যান্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নকশার ডায়নামিক আইল্যান্ডে একই সময়ে সর্বোচ্চ তিনটি ‘লাইভ অ্যাকটিভিটি’ দেখানো যাবে। ব্যাটারি সক্ষমতাতেও বড় উন্নতি করা হয়েছে। বিশেষ করে আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে ই-সিম ব্যবহার করলে একবার চার্জে সর্বোচ্চ ৪৫ ঘণ্টা ভিডিও দেখা যাবে।
আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে নতুন প্রজন্মের সি২ সেলুলার মডেমও যুক্ত করা হয়েছে। আগের মডেমের তুলনায় এটি দ্রুত কাজ করার পাশাপাশি ১৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ খরচ করবে। ব্ল্যাক, সিলভার, গ্লেসিয়ার ও বারগান্ডি রঙে বাজারে পাওয়া যাবে ফোন দুটি। আইফোন ১৮ প্রোর দাম শুরু হবে ১ হাজার ১৯৯ ডলার থেকে এবং আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের দাম ১ হাজার ২৯৯ ডলার থেকে। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে আগাম ফরমাশ কার্যক্রম শুরু এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে পাওয়া যাবে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন (এএনসি) সুবিধাসহ নতুন এয়ারপডস ৫ উন্মোচন করেছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এয়ারপডস ৪-এর এএনসি সংস্করণের তুলনায় নতুন এয়ারপডস ৫ বাইরের শব্দ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি কমাতে পারে। নতুন মাল্টিপোর্ট অ্যাকোস্টিক আর্কিটেকচার ও উন্নত অ্যাডাপটিভ ইকিউ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এর শব্দের মানও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স-নির্ভর লাইভ ট্রান্সলেশন সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দের ভাষায় অনুবাদ করা কথোপকথন শুনতে পারবেন। এয়ারপডস ৫-এর সাধারণ সংস্করণের দাম ধরা হয়েছে ১২৯ ডলার। ওয়্যারলেস চার্জিং কেস, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং স্টেমে ভলিউম নিয়ন্ত্রণের সুবিধাসহ আরেকটি সংস্করণের দাম ধরা হয়েছে ১৪৯ ডলার। দুটি সংস্করণই ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারে পাওয়া যাবে।
অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২ ও অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪ আপডেট করেছে অ্যাপল। দুটি মডেলেই নতুন ‘হেলথ সেন্সিং সিস্টেম’ যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপলের দাবি, এটি যেকোনো পরিধানযোগ্য ডিভাইসের তুলনায় সবচেয়ে নির্ভুলভাবে হৃৎস্পন্দন শনাক্ত করতে পারে। অ্যাপলের তথ্যমতে, নতুন এস১১ চিপের সাহায্যে দুটি ঘড়িই সারা দিন প্রতি পাঁচ সেকেন্ড পরপর ব্যবহারকারীর হৃৎস্পন্দন মাপতে পারবে। দুটি মডেলেই ‘রেডিনেস’ নামের নতুন একটি সুবিধা যুক্ত করা রয়েছে। শারীরিক কার্যক্রম, ব্যায়ামের চাপ, বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও ঘুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন তথ্য জানাবে এই সুবিধা।
এস১১ চিপযুক্ত দুটি ঘড়িতেই অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স ও প্রাইভেট ক্লাউড কম্পিউটনির্ভর ‘অডিও ইন্টেলিজেন্স’ সুবিধা যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সাউন্ড রিকগনিশন’, যা বধির বা কম শোনেন এমন ব্যবহারকারীদের সাইরেন, অ্যালার্ম বা দরজার ঘণ্টার মতো শব্দ শনাক্ত করে সতর্ক করবে। ওয়াচওএস ২৭–এর মাধ্যমে দুটি মডেলেই নতুন সিরি অ্যাপ ও আলাদা ‘সিরি মডিউলার’ ওয়াচ ফেস থেকে এআইনির্ভর সিরি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যাবে। ঘড়িটি দাম শুরু হবে ৭৯৯ ডলার থেকে।
সূত্র: অ্যাপল, ম্যাশেবল