বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাসই বড় কথা নয়
বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাসই বড় কথা নয়

অভিমত

ডিজিটাল শক্তি: প্রযুক্তি মানুষের হাতে থাকবে নাকি বাজারের নিয়ন্ত্রণে

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইন্টারনেটের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজারে, মোবাইল ফোনের গ্রাহকসংখ্যা ১৮ কোটি ৫৮ লাখে। দেশে ১ হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে, প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট ডিজিটাল কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে, তবু অন্তর্ভুক্তি, প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন এখনো তীব্র।

বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাস আছে এবং থাকারই কথা। মোবাইল ফোন আজ শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ব্যাংকিং, কেনাকাটা, টিকিট, চিকিৎসা, পড়াশোনা, সরকারি সেবা, বিনোদন, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেরও বড় অংশ এখন পর্দার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেনারেটিভ এআই। ফলে প্রযুক্তি আর কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক জীবনের নতুন অবকাঠামো। কিন্তু অবকাঠামো যত জরুরি হয়, তা ঘিরে প্রশ্নও তত গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ, সড়ক, বিদ্যুৎ বা পানির মতোই ডিজিটাল অবকাঠামোও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। কে প্রবেশাধিকার পাবে, কে বাদ পড়বে, কার ভাষা জায়গা পাবে, কার তথ্য পণ্য হবে আর কার জীবন অ্যালগরিদমের ছাঁকনিতে পড়ে যাবে, সেটি প্রযুক্তির নকশাই ঠিক করে।

সংযোগের পরিসংখ্যান দিয়ে অগ্রগতি

বাংলাদেশে আমরা সাধারণত সংযোগের পরিসংখ্যান দিয়ে অগ্রগতির গল্প বলি। এই গল্প পুরোপুরি মিথ্যা নয়, তবে অসম্পূর্ণ। কারণ, গ্রাহকসংখ্যা আর ব্যবহার এক বিষয় নয়; ব্যবহার আর ক্ষমতায়নও এক নয়। গত জানুয়ারিতে ১২ কোটির বেশি ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও, ব্যক্তি স্তরে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখনো অর্ধেকের নিচে। এর মানে দাঁড়ায়, নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটেছে বটে, কিন্তু সেই নেটওয়ার্কের ভেতরে সমান সক্ষমতার নাগরিক সমাজ তৈরি হয়নি। আমরা প্রায়ই ধরে নিই, সংযোগ পৌঁছালেই উন্নয়ন পৌঁছায়। বাস্তবতা হলো, সংযোগ কেবল দরজা খোলে; কে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে, তা নির্ধারণ করে আয়, লিঙ্গ, শিক্ষা, ভাষা, যন্ত্র, ব্যয়ের সামর্থ্য, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নীতিগত সুরক্ষা।

এই বৈষম্যের চিত্র ঘরের ভেতরের পরিসংখ্যানে আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা গেছে, ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি মোবাইল ফোন আছে, ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কম্পিউটার আছে মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারে। শহরে স্মার্টফোনের উপস্থিতি ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ, গ্রামে ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার ৫১ দশমিক ২ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ। আবার নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানাতেও ব্যবধান আছে—পুরুষ ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ, নারী ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব সংখ্যা কেবল প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যান নয়; এগুলো সামাজিক ক্ষমতার মানচিত্র।

এ কারণেই প্রযুক্তিকে শুধু উন্নয়নের ভাষায় দেখা বিভ্রান্তিকর। প্রযুক্তি সুবিধা দেয় ঠিক; কিন্তু প্রযুক্তি ক্ষমতাও বণ্টন করে। যে প্ল্যাটফর্ম আমাদের কথা বলার সুযোগ দেয়, সেটিই হয়তো আমাদের আচরণ নজরদারি করে। যে অ্যাপ সেবা সহজ করে, সেটিই হয়তো আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। যে অ্যালগরিদম দ্রুত ফল দেয়, সেটিই হয়তো অস্বচ্ছ পক্ষপাতকে স্বাভাবিক করে তোলে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে বিতর্ক কখনোই কেবল সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার বা স্টার্টআপের বিতর্ক নয়। এটি আসলে নাগরিক মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। এ কারণেই ‘ডিজিটাল শক্তি’ কথাটি এত জরুরি—প্রযুক্তির ওপর কার প্রভাব থাকবে, কারা শর্ত নির্ধারণ করবে আর কারা নিছক ব্যবহারকারী হয়ে থাকবে?

কঠিন বাস্তবতা জুলাই ’২৪–এ

বাংলাদেশ এ প্রশ্নের এক কঠিন বাস্তব রূপ দেখেছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। তখন ইন্টারনেট ও টেক্সট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাগরিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন সেবা ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলেছে, এই ‘শাটডাউন’ কেবল রাজনৈতিক ঘটনাই ছিল না; ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে অনলাইন শ্রমবাজার, পর্যটন, আর্থিক লেনদেন, এমনকি সাধারণ মানুষের পারিবারিক যোগাযোগও এতে বিপর্যস্ত হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা আমাদের নির্মমভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে, ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি জনজীবনের মৌলিক অবকাঠামো।

ডিজিটাল সেবা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা

রাষ্ট্রও দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। এটুআই-সমর্থিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট বৃহত্তর ডিজিটাল রূপান্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি বড় অর্জন। বহু নাগরিকের সময়, খরচ ও যাতায়াত কমেছে, তথ্যের নাগাল বেড়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও কিছু ক্ষেত্রে সহজ হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের ভেতরেই আরেকটি সতর্কবার্তা লুকিয়ে আছে। এটুআই আয়োজিত এক সেমিনারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দ্রুত সম্প্রসারিত এসব ডিজিটাল সেবা এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পুরোপুরি প্রবেশযোগ্য নয়। অর্থাৎ সেবা ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু সমানভাবে নাগরিকবান্ধব হয়নি।

এই জায়গায় এসে ‘প্রবেশগম্যতা’ শব্দটির রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা জরুরি। অনেকেই একে বাড়তি সুবিধা মনে করেন। আসলে এটি গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্ন। একটি সরকারি ওয়েবসাইট যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর জন্য কাজ না করে, একটি অনলাইন ফরম যদি সাধারণ ভাষায় বোধগম্য না হয়, একটি সেবা যদি ডিজিটাল হওয়ার পরও ব্যবহারকারীর হাতে প্রতিকারের পথ না রাখে, তাহলে আমরা কেবল পুরোনো বঞ্চনাকেই নতুন পর্দায় তুলে আনছি। ডিজিটাল রাষ্ট্র তখন আধুনিক দেখাতে পারে, কিন্তু ন্যায়সংগত হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা, ডিজাইনের জটিলতা এবং প্রবেশগম্যতার সীমাবদ্ধতা মিলে প্রযুক্তিকে তখন অনেকের জন্য মুক্তির নয়, নতুন বিভাজনের যন্ত্রে পরিণত করে।

র‍্যাঙ্কিং ও নাগরিক অধিকার মজবুত হওয়া এক বিষয় নয়

আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১৯৩ দেশের মধ্যে ১০০তম স্থানে উঠে এসেছে; ২০২২ সালে অবস্থান ছিল ১১১। এই উন্নতি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু র‍্যাঙ্কিং বাড়া আর নাগরিক অধিকার মজবুত হওয়া এক বিষয় নয়। একটি রাষ্ট্র ডিজিটাল সেবা বাড়াতে পারে, অনলাইন পোর্টাল খুলতে পারে, স্কোর উন্নত করতে পারে; তবু তার নাগরিক হয়তো জানেন না তাঁর তথ্য কোথায় জমা হচ্ছে, কোনো ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোথায় আপিল করবেন অথবা ডিজিটাল সেবার ব্যর্থতার দায় কার। ডিজিটাল অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন তা নাগরিকের হাতে বেশি স্বচ্ছতা, বেশি প্রতিকার এবং বেশি নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়।

এখানে উপাত্তের প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ২১ মে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। একই বছরের ৬ নভেম্বর ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত উপাত্তকে ব্যক্তির মালিকানাধীন হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। আইনগতভাবে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু আইনের ভাষাই শেষ কথা নয়। প্রশ্ন হলো, নাগরিক কি বাস্তবে জানতে পারবেন তাঁর তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে? সম্মতি সত্যিকার অর্থেই সচেতন সম্মতি হবে নাকি দীর্ঘ ও দুর্বোধ্য শর্তাবলির আড়ালে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে? তথ্য অপব্যবহার হলে প্রতিকার কত দ্রুত মিলবে? ডিজিটাল অধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা আদালতের ভাষায় নয়, নাগরিকের অভিজ্ঞতায়।

জেনারেটিভ এআই এই আলোচনাকে আরও জটিল ও জরুরি করেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় এআই রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ইউএনডিপি ও ইউনেসকো-সমর্থিত এই মূল্যায়নে জোর দেওয়া হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও মানবকেন্দ্রিক এআই উন্নয়নের ওপর। এই সতর্কতা অকারণ নয়। এআই কেবল লেখা, ছবি বা অনুবাদের যন্ত্র নয়; এটি জ্ঞানকে সাজায়, দৃশ্যমানতা নির্ধারণ করে, সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, শ্রমবাজারের কাঠামো বদলায় আর ভাষাগত ও সামাজিক পক্ষপাতকে পুনরুৎপাদনও করতে পারে। বাংলা ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং শিশু-নারী-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাস্তবতা যদি নকশার ভেতর না ঢোকে, তাহলে এআই উন্নয়ন খুব দ্রুত নতুন বৈষম্যের কারখানায় পরিণত হতে পারে।

ডিজিটাল সক্ষমতা

বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসর নিয়েও একই প্রশ্ন ওঠে। ডেটারিপোর্টালের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশে ৬ কোটি ৪০ লাখ সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচিতি ছিল, যা মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩ শতাংশের সমান। অবশ্য এই সংখ্যা ‘ইউনিক ব্যক্তি’ নয়, ‘ইউজার আইডেনটিটি’। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় হলো এর তাৎপর্য। আমাদের জনপরিসরের বড় অংশ এখন এমন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল, যাদের প্রধান ব্যবসায়িক লক্ষ্য জনস্বার্থ নয়, মনোযোগ ধরে রাখা। ফলে যে কনটেন্ট উত্তেজনা বাড়ায়, যে বক্তব্য বিভাজন বাড়ায়, যে তথ্য দ্রুত ছড়ায়, সেটিই এগিয়ে যায়। তখন জনপরিসরের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নাগরিকের হাত থেকে অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত বাজারের হাতে সরে যায়।

এখানেই ‘ডিজিটাল এজেন্সি’ বা ডিজিটাল সক্ষমতার প্রশ্নটি কেন্দ্রে আসে। এজেন্সি মানে কেবল মোবাইল চালাতে জানা নয়। এর মানে প্রযুক্তির শর্ত বোঝা। নিজের উপাত্ত নিয়ে সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া। অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম, বৈষম্যমূলক অ্যালগরিদম, অনিরাপদ অনলাইন পরিবেশ এবং অপ্রবেশযোগ্য সরকারি সেবার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার নাগরিক শক্তি থাকা। আমরা যদি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখি, কিন্তু তার নকশা, নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে কথা বলতে না শিখি, তাহলে আমরা দক্ষ ব্যবহারকারী হতে পারি, স্বাধীন ডিজিটাল নাগরিক হতে পারি না। ডিজিটাল সাক্ষরতা তাই কেবল ক্লিক, স্ক্রল আর অ্যাপ ডাউনলোডের দক্ষতা নয়; এটি এখন গণতান্ত্রিক নাগরিক শিক্ষার অংশ।

এই জায়গায় এসে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে কি প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে? উত্তর হলো, মোটেও না। বরং উল্টো। প্রযুক্তিকে মানুষের পক্ষে ফিরিয়ে আনার লড়াইটাই এখন জরুরি। কারণ, বাজারের যুক্তি খুব সরল, বেশি ব্যবহারকারী, বেশি ডেটা, বেশি সময়, বেশি বিজ্ঞাপন, বেশি মুনাফা। সমাজের যুক্তি অন্য রকম, বেশি মর্যাদা, বেশি নিরাপত্তা, বেশি অন্তর্ভুক্তি, বেশি স্বচ্ছতা, বেশি জবাবদিহি। এ দুই যুক্তি সব সময় এক পথে হাঁটে না। অনেক সময় এরা সরাসরি সংঘর্ষে যায়। একটি দায়িত্বশীল সমাজের কাজ হলো বাজারকে বাতিল করা নয়, বরং তাকে এমন নীতির ভেতরে আনা, যেখানে মানুষের অধিকার, শিশুদের নিরাপত্তা, নারীর স্বাধীনতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশাধিকার, ভাষাগত বৈচিত্র্য ও নাগরিক প্রতিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের করণীয় কী

বাংলাদেশের সামনে তাই করণীয় মোটামুটি স্পষ্ট। প্রথমত, ডিজিটাল নীতিকে শুধু উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও স্টার্টআপের ভাষায় না দেখে অধিকার, ন্যায় ও জনস্বার্থের ভাষায় দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি নকশায় প্রবেশগম্যতা, বাংলা ভাষা, সহজ ভাষায় সেবা, প্রতিকারব্যবস্থা, গোপনীয়তা সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও অ্যালগরিদমিক জবাবদিহিকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রযুক্তিবিদ বা করপোরেট বোর্ডরুমের একচেটিয়া বিষয়ে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, নাগরিক সমাজ, নারী সংগঠন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, তরুণ, স্থানীয় উদ্যোক্তা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবহারকারীকেও এই আলোচনার অংশ করতে হবে। কারণ, প্রযুক্তির বৈধতা কেবল দক্ষতা থেকে আসে না; তা আসে ন্যায়সংগত অংশগ্রহণ থেকেও।

সবশেষে কথাটা সহজ, কিন্তু গভীর। বাংলাদেশ সংযোগের যুগে ঢুকে গেছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি অধিকারের যুগে ঢোকেনি। আমরা এখনো এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তির গতি দৃশ্যমান; কিন্তু তার ন্যায়সংগত দিকনির্দেশনা নিশ্চিত নয়। আমাদের দরকার এমন এক ডিজিটাল দর্শন, যেখানে নাগরিক শুধু ইউজার নয়, অংশীদার; শুধু উপাত্ত নয়, মানুষ; শুধু ভোক্তা নয়, অধিকারসম্পন্ন সত্তা। বাজারের প্রযুক্তি দরকার, উদ্ভাবন দরকার, বিনিয়োগও দরকার। কিন্তু বাজারনির্ভর ভবিষ্যৎ যথেষ্ট নয়। আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার মানে প্রযুক্তিকে থামানো নয়; বরং প্রযুক্তিকে মানুষের শর্তে ফিরিয়ে আনা। কারণ, রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজের এই ত্রিভুজে যদি মানুষের মর্যাদা কেন্দ্রে না থাকে, তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়তো দ্রুত এগোবে, কিন্তু সমানভাবে এগোবে না। আর অসম ডিজিটাল ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রেরও অসম ভবিষ্যৎ।

এ এইচ এম বজলুর রহমান: ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক