ইউটিউবের গোল্ডেন প্লে বাটন হাতে সেলিম হোসেইন
ইউটিউবের গোল্ডেন প্লে বাটন হাতে সেলিম হোসেইন

ছোটদের জন্য সেলিমের ইউটিউব কনটেন্ট, গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ

যেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র শেষ, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল সেলিম হোসেইনের এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নের পথচলা। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্তে বেড়ে ওঠা যে ছেলেটি সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার ঘুমভাঙা দেখত, সে একদিন দেশের ডিজিটাল কনটেন্ট বা আধেয়র জগতে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। মাটি ও মানুষের খুব কাছ থেকে উঠে আসা এই স্বপ্নবান তরুণই আজ বাংলাদেশের ‘কোকোমেলন’–খ্যাত জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল ‘মুভ কিডজ (Movkidz)’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখান থেকেই মাসে আয় করছেন আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। শিশুদের কনটেন্ট তৈরির কাজে আছেন সাতজন। এর পাশাপাশি সেলিম হোসেইন রাজধানীর ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও কাজ করছেন।

স্বপ্নের ডাক ও ঢাকার পথ

ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত সেলিমের চোখে বড় হওয়ার স্বপ্নেরা বাসা বাঁধতে শুরু করে স্কুলজীবন থেকেই। বাংলাবান্ধার ফকিরপাড়া বি এল উচ্চবিদ্যালয় থেকে যখন দু-একজন ছাত্র ঢাকায় পড়তে যেত, তাদের নিয়ে পুরো এলাকা করত গর্ববোধের গল্প। সেই গল্প শুনেই ছোট্ট সেলিমের মনে ঢাকা শহর এক মায়ার জগৎ হয়ে উঠেছিল। ফ্লাইওভার, জাদুঘর—সবই যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত।

কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই স্বপ্ন ছিল এক বিরাট দুঃসাহস। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, ছেলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সংসারের হাল ধরুক। চাকরির দোরগোড়ায় পৌঁছেও গিয়েছিলেন তিনি। ভেতরের স্বপ্নের ডাক উপেক্ষা করতে না পেরে একদিন তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড়, আর পঞ্চগড় থেকে ঢাকার পথে পা বাড়ালেন তিনি।

বাস্তবতার পাঠ ও নতুন পথের সন্ধান

২০০৯ সালে ঢাকায় এসে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন সেলিম। ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি তিতুমীর কলেজে। জীবনযাপনের তাগিদে এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় শুরু করেন টিউশনি। একে একে ৩০টির বেশি টিউশনি করালেও মন ভরছিল না। চারপাশের বন্ধুরা যখন বিসিএস বা ব্যাংকের চাকরির জন্য পড়ছেন, সেলিম তখন নিজেকে খুঁজছিলেন। তিনি জানতেন, গতানুগতিক পড়াশোনা তাঁকে টানে না।

ঠিক সেই সময়েই এক নতুন পথের সন্ধান মেলে। তাঁর রুমমেট ছিলেন একটি বেসরকারি চ্যানেলের ভিডিওগ্রাফার। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে মিডিয়া জগতের প্রতি একধরনের আগ্রহ তৈরি হয়। তবে তাঁর মন টানে ভিডিও সম্পাদনায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সৃজনশীল কাজ আর ভালো বেতনের পেশা—এমন কিছুই যেন তিনি খুঁজছিলেন।

পথচলার শুরু

ভিডিও সম্পাদনা শেখার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি সন্ধান পান ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের। প্রতিষ্ঠানটি তখন সবে যাত্রা শুরু করেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা মনির হোসেন নিজেই ক্লাস নিতেন। পরিবারের অমত সত্ত্বেও মায়ের জমানো টাকায় কোর্সে ভর্তি হন সেলিম। তবে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় ব্যাচ শুরু হতে দেরি হচ্ছিল। সেলিমের প্রবল আগ্রহ দেখে মনির হোসেন তাঁকে গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে যুক্ত করে দেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর ভিডিও সম্পাদনা ক্যারিয়ারে নানাভাবে সাহায্য করে।

অবশেষে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী নিয়ে ভিডিও সম্পাদনা কোর্স শুরু হয়। নিজের কম্পিউটার না থাকায় প্রতিষ্ঠানের বা রুমমেটের কম্পিউটারে দিনরাত অনুশীলন করতেন। শেখার প্রতি তাঁর এই অদম্য আগ্রহ দেখে মনির হোসেন তাঁকে আরটিভির প্রোডাকশন টিমের একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেখান থেকেই তিনি সম্পাদনার অ্যাডভান্সড কৌশল শেখার সুযোগ পান এবং একসময় তাঁর বিকল্প হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান, যা ছিল তাঁর জীবনের এক অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

পেশাদার জীবন, ধাক্কা ও ঘুরে দাঁড়ানো

নিজেকে প্রমাণের সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগান সেলিম। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন পাকা পেশাদার। বেশ কয়েকটি প্রোডাকশন হাউসে কাজ করার পর ২০১৪ সালে একটি বড় ধাক্কা খান। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য টানা ৯ মাস ধরে একটি প্রজেক্টের প্রধান এডিটর হিসেবে কাজ করার পর জানতে পারেন, প্রোগ্রামটি আর অনএয়ার হচ্ছে না। এরপর আরেকটি হাউসে কাজের চাপ আর কম বেতনের সঙ্গে পেরে না উঠে যখন তিনি প্রায় দিশাহারা, তখনই আবার তাঁর জীবনে আলোকবর্তিকা হয়ে আসেন তাঁর মেন্টর মনির হোসেন।

২০১৫ সালে ক্রিয়েটিভ আইটির ডিজিটাল বিপণন বিভাগে কনটেন্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়। নিজের মেধা আর পরীক্ষামূলক সব কাজ দিয়ে তিনি অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠানের কনটেন্টের চেহারা বদলে দেন। ২০১৮ সালে ‘ভালোবাসার বাংলাদেশ’ প্রচারণায় তাঁর তৈরি দুটি কনটেন্ট সেরা ১০০-এর মধ্যে জায়গা করে নেয় এবং একটি সেরা দশে স্থান পায়।

মুভ কিডজ চ্যানেল

উদ্যোক্তা সেলিম এবং মুভ কিডজের জন্ম

ক্রিয়েটিভ আইটিতে তিনি শুধু চাকরিই করেননি, প্রতিষ্ঠানটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখান থেকে এখন পর্যন্ত চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী কোর্স সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষার্থীদের শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রি) অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর মেন্টর মনির হোসেনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুভ রিলস স্টুডিও’।

এরপর আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। কোভিড–পরবর্তী সময়ে মনির হোসেনের পরামর্শে তিনি ছোটদের জন্য কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা করেন। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় বাংলাদেশের ‘কোকোমেলন’ খ্যাত ইউটিউব চ্যানেল ‘মুভ কিডজ’। চ্যানেলটির বর্তমান গ্রাহকসংখ্যা ১৯ লাখ ৪০ হাজার এবং ৮০টির বেশি ভিডিও ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়েছে। সম্প্রতি চ্যানেলটি ইউটিউব থেকে গোল্ডেন প্লে বাটন সম্মাননাও পেয়েছে।

মুভ কিডজ চ্যানেলের কর্মীরা

স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে

বর্তমানে সেলিম হোসেইন একাই সামলে যাচ্ছেন মেন্টরশিপ, প্রোডাকশন হাউসের কাজ এবং ফিল্ম ক্লাবের মডারেটরের দায়িত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেছেন। তাঁর স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি চান মুভ রিলস স্টুডিও থেকে একদিন সিনেমা তৈরি হবে। একজন ট্রাভেল ভ্লগার হয়ে বিশ্ব ঘুরে দেখার পাশাপাশি তাঁর স্টুডিওকে একটি এআইভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের কমার্শিয়াল স্টুডিও হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।

সেলিম হোসেইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘২ মিলিয়ন বা ২০ লাখ গ্রাহকের দ্বারপ্রান্তে মুভকিডজ। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের সুস্থ বিনোদন এবং শিক্ষার অন্যতম প্রিয় নাম হয়ে উঠেছে ইউটিউব চ্যানেল মুভকিডজ। এর সাফল্যের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে আমাদের ছোট ছোট কনটেন্ট। ভবিষ্যতে আরও আকর্ষণীয় অ্যানিমেশন ও সহজবোধ্য উপস্থাপনার কারণে কেবল দেশেই নয়, দেশের বাইরেও বাংলা ভাষাভাষী শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’