জাতীয় বাজেট সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবকাঠামো বিনির্মাণে করণীয় বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রযুক্তি খাতে চলছে নানা ধরনের আলোচনা। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন বিশেষজ্ঞের কাছে বাজেট সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যাশা জানতে চাওয়া হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে বাজেটে নিজেদের প্রত্যাশা তুলে ধরার পাশাপাশি বেশ কিছু বিষয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
আসন্ন বাজেটে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৃত রূপান্তরের জন্য ক্লাউড কম্পিউটিং, নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মানসম্মত মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (আইআইটি) পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি জানান, বিশ্বের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এখন ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টার–সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা সামনের দিনগুলোয় আরও বহুগুণ বাড়বে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগাতে আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। আসন্ন বাজেটে এই খাত–সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার যেন দেশেই তৈরি করা যায়, তার জন্য বিশেষ কর–সুবিধা দেওয়া উচিত। যদি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি এখনই দেশে তৈরি করা সম্ভব না–ও হয়, অন্ততপক্ষে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজনের ছোট ছোট দেশীয় ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প যেন গড়ে ওঠে, তার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এতে দেশের আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা জরুরি উল্লেখ করে অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন জানান, দেশের প্রযুক্তিবিদ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের তৈরি নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট উদ্ভাবন, সফটওয়্যার বা বিশেষ উদ্যোগগুলোকে বাজেটে বিশেষ আর্থিক ও কর–সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আমাদের নিজেদের তৈরি সমাধানগুলো যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বা উপাত্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এ ছাড়া দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো দক্ষ লোকবল। সরকার প্রতিবছর দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য বিপুল বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমগুলোকে কেবল নামসর্বস্ব না রেখে সেগুলোকে ফলপ্রসূ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের যেসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠানগুলো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উত্তীর্ণ হতে পারবে এবং যাদের প্রশিক্ষণার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার প্রমাণ দেবে, সেই সব মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ কর মওকুফের সুবিধা দিতে হবে। বাজেটে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কর মওকুফের ব্যবস্থা থাকলে তা দেশে মানসম্পন্ন ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ প্রদানকে দারুণভাবে উৎসাহিত করবে, যা দিন শেষে বাংলাদেশের জন্য এক দক্ষ ও বৈশ্বিক মানের জনশক্তি গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রামের মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ। এই বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিতে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন উন্নয়নকর্মী, গবেষক এবং ‘আমাদের গ্রাম’ প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রেজা সেলিম। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা রেজা সেলিম আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের নানা সংকট ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, গ্রামের মানুষের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ নয়। তাই সাধারণ ও প্রাথমিক রোগগুলোর চিকিৎসা যাতে গ্রামীণ মানুষ অনায়াসে নিজ এলাকাতেই পেতে পারেন, সে জন্য আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কাজ করছি। কিন্তু এই মহৎ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল ইন্টারনেট অবকাঠামো। ইন্টারনেট গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ মিলছে না। প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের রোগীদের জটিল রোগ নির্ণয়ে প্রায়ই দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি সংযুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট সংযোগের গতি এবং সামগ্রিক মান অত্যন্ত দুর্বল, যে কারণে টেলিমেডিসিন সেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেটের এই ধীরগতি ও ঘন ঘন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চিত্র অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত সংকটের কথা উল্লেখ করে রেজা সেলিম জানান, নিরবচ্ছিন্ন ডেটা আদান-প্রদান ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের জন্য রিয়েল আইপি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট সেবার মূল অভিভাবক হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল। তাদের মাধ্যমেই মূলত রিয়েল আইপি পাওয়া সম্ভব। বেসরকারি ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে রিয়েল আইপি পাওয়া যায় না বললেই চলে, আর পেলেও এর জন্য গুনতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু বিটিসিএলের কাছ থেকে এই রিয়েল আইপি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির এবং আমলতান্ত্রিক জটিলতায় পূর্ণ। আমরা যদি বাগেরহাটে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য সংযোগ বা আইপি নিতে চাই, তবে আবেদনপত্র জমা দিতে যেতে হয় খুলনায়। খুলনায় কাজ না হলে আবার ছুটতে হয় ঢাকার মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এ ধরনের ভোগান্তি দূর করতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে দ্রুত ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে আসন্ন বাজেটে বিটিসিএলের আধুনিকায়ন ও আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দিতে হবে। বিটিসিএলকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা গেলে গ্রামীণ পর্যায়ে মানসম্মত প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হবে।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট নীতিসহায়তা ও অর্থায়নের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সেবার আওতায় এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই অগ্রগতির আড়ালে এখনো বড় ধরনের ডিজিটাল–বৈষম্য রয়ে গেছে। কারণ, দেশের প্রায় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করতে আসন্ন বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ালেই ডিজিটাল উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না।
সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এ এইচ এম বজলুর রহমান জানান, প্রযুক্তির নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় প্রান্তিক মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইন প্রতারণা, ভুল তথ্য, গুজব ও নানা ধরনের ডিজিটাল ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রসার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি–সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও কমিউনিটি রেডিওকে যুক্ত করে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। সাইবার জগতে অপতথ্য, গুজব ও প্রতারণা প্রতিরোধে শুধু প্রযুক্তিগত নজরদারি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা, গণমাধ্যমের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি ও নাগরিক পর্যায়ে ডিজিটাল দায়িত্ববোধ তৈরি। তাই জাতীয় বাজেটে ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, গণমাধ্যম উন্নয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ের সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ রাখা এখন সময়ের দাবি।
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সরকারিভাবে নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হলেও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ ফ্রিল্যান্সাররা তা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন এমরাজিনা টেকনোলজিস ও কাজ৩৬০ প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা এমরাজিনা ইসলাম খান। ফ্রিল্যান্সারদের নানা প্রত্যাশা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সরকারিভাবে নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হলেও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ ফ্রিল্যান্সাররা তা পাচ্ছেন না। প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠালে যেভাবে সরাসরি রেমিট্যান্সের প্রণোদনা পান, ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে কোনো বাধা ছাড়াই যেন প্রণোদনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বড় বাধা ট্রেড লাইসেন্স জটিলতা।
নির্দিষ্ট ভৌত অবকাঠামো বা স্থায়ী অফিস না থাকায় ফ্রিল্যান্সাররা ব্যাংক ঋণ বা আইনি কাজের জন্য ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হন উল্লেখ করে এমরাজিনা ইসলাম খান জানান, বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের ফ্রিল্যান্সিং আইডি কার্ড বা পেশাদার স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে সহজে ও স্বল্প খরচে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের বিশেষ সুযোগ দিতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে কাজ করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায় হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের সীমাবদ্ধতা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দেশের বাইরে ডলারের মাধ্যমে একবারে ৩০০ ডলারের বেশি মূল্যের কোনো গ্লোবাল সার্ভিস বা সফটওয়্যার কেনা যায় না। কিন্তু ফ্রিল্যান্সারদের বড় বড় কাজ করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম টুলস ও সার্ভিসের প্রয়োজন হয়। এই আর্থিক বাধার কারণে ফ্রিল্যান্সাররা বড় বড় কাজ হাতছাড়া করছেন। বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এই বৈধ ডলার খরচের সীমা যৌক্তিকভাবে বাড়াতে হবে। আসন্ন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দও রাখতে হবে।