বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

বাজেট-ভাবনা

কম্পিউটারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনার দাবি বিসিএস সভাপতির

বাংলাদেশে প্রযুক্তির হাত ধরে যে নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে, তার চালিকা শক্তি এ দেশের তরুণ সমাজ। তবে এই রূপান্তরকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের অগ্রযাত্রাকে খুব কাছ থেকে দেখছেন। দেশের সার্বিক প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এবং তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতাসক্ষম করে গড়ে তুলতে আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে তিনি তাঁর ভাবনা প্রথম আলোর কাছে তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য উল্লেখ করে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে পারিবারিক পর্যায়ে কম্পিউটারের প্রাপ্যতা ১০ শতাংশের কম। অর্থাৎ দেশের ৯০ শতাংশের বেশি পরিবার এখনো নিজ ঘরে কম্পিউটার ব্যবহার থেকে বঞ্চিত। এই বিশাল ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে বাজেটে কম্পিউটারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে হবে। তরুণদের যদি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দেওয়া না হয়, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তাই বাজেটে কম্পিউটারের ওপর শুল্ক ও কর পুনর্বিন্যাস করে ল্যাপটপ ও কম্পিউটারকে আরও সহজলভ্য করতে হবে। বাজেটে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে বিশেষ প্রযুক্তি ঋণ বা ল্যাপটপ কেনার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার।

বর্তমান বিশ্ব প্রতিনিয়ত দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং ব্লকচেইনের মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিগুলো এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল নিয়ামক। এ বাস্তবতায় দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার ওপর জোর দিয়ে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগী বিষয়ে পড়ার সুযোগ ব্যাপক হারে তৈরি হয়, সে জন্য আসন্ন বাজেটে উচ্চশিক্ষা খাতে বিশেষ গবেষণা ও অবকাঠামোগত বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ডেটা প্রাইভেসি বা তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্বল। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশের বিভিন্ন ক্লাউড সার্ভারে জমা রাখা হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য ফাঁসের খবর আমাদের সামনে আসে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। আর তাই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে বিশ্বমানের নিজস্ব ডেটা সেন্টার ও সাইবার সিকিউরিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে ফ্রিল্যান্সারদের অবদান এখন অনস্বীকার্য। তবে এখনো অনেক ফ্রিল্যান্সার তাঁদের কষ্টার্জিত আয় সরাসরি দেশে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাংকিং জটিলতার মুখোমুখি হন। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমকে আরও আধুনিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, ফ্রিল্যান্সাররা যেন তাঁদের উপার্জিত অর্থ কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই সরাসরি তাঁদের মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসতে পারেন, আসন্ন বাজেটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে সে–সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ও সহজ নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। এ রকম হলে বৈধ পথে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ একধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে।

দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা ও কর রেয়াত দেওয়া উচিত বলে মনে করেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সব কেনাকাটায় দেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সফটওয়্যার এবং প্রযুক্তি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে যেমন দেশের মেধা দেশে থাকবে, তেমনি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।