এআইয়ের সহায়তায় ইন্টারনেটের সুরক্ষা প্রটোকল বা এনক্রিপশন ভেঙে ফেলতে সক্ষম কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই চলে আসতে পারে বলে এক গবেষণাপত্রে জানিয়েছে গুগল এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং স্টার্টআপ ওরাটমিক। নতুন এ তথ্যকে বেশ উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের সাইবার নিরাপত্তা গবেষক বাস ওয়েস্টারবান জানিয়েছেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এনক্রিপশন ভেঙে ফেলতে সক্ষম কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে গেলে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ডিজিটাল সিস্টেম হ্যাকারদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে তথ্য ফাঁস, চাঁদাবাজি এবং বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অফলাইনে চলে যাওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রস্তুতি নেওয়ার গতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ক্লাউডফ্লেয়ার ২০২৯ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম উপযোগী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিউবিট ইউনিটের মাধ্যমে কাজ করে, যা সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় কয়েক কোটি গুণ দ্রুত গণনা করতে সক্ষম। বর্তমানে আমরা হোয়াটসঅ্যাপে আদান–প্রদান করা বার্তা বা অতি গোপনীয় নথির সুরক্ষায় যে এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তা ভাঙতে বর্তমানের সুপারকম্পিউটারের কয়েক হাজার কোটি বছর লেগে যাবে। তবে একটি শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তাত্ত্বিকভাবে মাত্র কয়েক দিনেই এ সুরক্ষা ভেঙে ফেলতে পারে।
পরমাণুভিত্তিক কোয়ান্টাম কম্পিউটারে একটি কিউবিট তৈরি করতে সাধারণত ১০০ থেকে ১ হাজার পরমাণুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওরাটমিকের গবেষকেরা এআইয়ের সহায়তায় এমন একটি অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যেখানে মাত্র তিনটি পরমাণু দিয়ে একটি কিউবিট তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের পরিমাণ প্রায় ১০০ গুণ কমে গেছে।
এ বিষয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত জন প্রেসকিল বলেন, ‘কিউবিটের সংখ্যা এত বেশি কমিয়ে আনা বেশ অবাক হওয়ার মতো বিষয়। যদিও এই গবেষণার মূল চালিকা শক্তি মানুষ। মানুষই এআইকে সঠিক প্রশ্ন করে সঠিক উত্তরের দিকে পরিচালিত করেছে।’
বিজ্ঞানী রবার্ট হুয়াং আগে গুগলের কোয়ান্টাম এআই দলে কাজ করতেন। ২০২৬ সালে তিনি গুগল ছেড়ে যৌথভাবে ওরাটমিক প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন গবেষণার বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, শুরুতে তাঁদের অ্যালগরিদমের কার্যকারিতা প্রত্যাশার চেয়ে এক হাজার গুণ খারাপ ছিল। তখন ওপেনইভলব নামের একটি ওপেনসোর্স টুল ব্যবহার করা হয়। এটি গুগলের জেমিনি ও অ্যানথ্রোপিকের ক্লডের মতো বড় এআই ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে কাজে লাগিয়ে অ্যালগরিদম অপটিমাইজ করে। এআই কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিভিন্ন ক্ষুদ্র উপশাখার জ্ঞানকে এমনভাবে সংমিশ্রণ করেছে, যা মানুষের পক্ষে ভাবা কঠিন ছিল।
প্রসঙ্গত, ২০৩৫ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি। তবে গুগল ও ওরাটমিকের গবেষণার নতুন ফলাফল এই সময়সীমাকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। এ বিষয়ে ওরাটমিকের গবেষক দলের সদস্য ব্লুভস্টেইন বলেন, ‘গতি বাড়াতে আমরা এআই ব্যবহার করেছি। এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। গবেষণাপত্রটি প্রকাশের আগে মার্কিন সরকারের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। এটি আমার লেখা প্রথম কোনো গবেষণাপত্র, যার সামাজিক প্রভাব নিয়ে আমি শঙ্কিত।’
সূত্র: টাইম ডটকম