ফ্রান্সের ব্রিটানি উপকূল তার সবুজ পাহাড় আর পাথুরে সৈকতের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেখানে বালুর বদলে দেখা দিচ্ছে সবুজ থকথকে এক আস্তরণ। উলভা আরমোরিকানা নামের একধরনের শৈবাল পচে গিয়ে সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করছে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। ব্রিটানি উপকূলের কর্দমাক্ত এলাকায় বছরের পর বছর ধরে সামুদ্রিক শৈবাল জমে পচে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এই পচা শৈবালের স্তর পাঁচ ফুট পর্যন্ত পুরু হয়ে আছে, যা আশপাশের উদ্ভিদ ও ছোট পাখিদের মেরে ফেলছে। আর তাই বর্তমানে এই উপকূলে লাল ও হলুদ সতর্কবার্তা সংকেত বসানো হয়েছে।
এই শৈবাল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার মূল কারণ হলো পানিতে উচ্চমাত্রার নাইট্রেটের উপস্থিতি। ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলটি কৃষিপ্রধান এলাকা। শিল্পায়িত খামারগুলোতে ব্যবহৃত কৃত্রিম সার এবং নাইট্রেট-সমৃদ্ধ পশুখাদ্য থেকে রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি সাগরে মিশছে। গবেষক আলিক্স লেভাইন এই শৈবালকে একটি দানব হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম একে ঘাতক শৈবাল নামে ডাকে।
চিকিৎসক পিয়েরে ফিলিপ ৩০ বছর ধরে এই শৈবালের বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করে আসছেন। তিনি ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন ল্যানিয়ন হাসপাতালে জ্যাক থেরিন নামের এক যুবকের মরদেহ আসার ঘটনা স্মরণ করে জানান, মরদেহের ব্যাগ খোলার পর তীব্র পচা ডিমের গন্ধে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না। দেহটি পরীক্ষা করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন কখনো জনসমক্ষে আসেনি।
১৯৯৯ সালে মরিস ব্রিফাল্ট নামের এক ব্যক্তি ট্রাক্টর দিয়ে সৈকত পরিষ্কার করার সময় জ্ঞান হারান। কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল, খোলা জায়গায় হাইড্রোজেন সালফাইডের ঘনত্ব প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছানো তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এমন হওয়ার প্রমাণ নেই। ২০০৯ সালে ভিনসেন্ট পেটিট নামের এক পশুচিকিৎসক তাঁর ঘোড়া নিয়ে সেই সৈকতে হাঁটছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটি শৈবালের আস্তরণে তলিয়ে যায় এবং জ্ঞান হারায়। ভিনসেন্ট বেঁচে গেলেও ঘোড়াটি মারা যায়। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, ঘোড়াটির ফুসফুসে প্রাণঘাতী মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড ছিল। এটিই ছিল প্রথম অকাট্য প্রমাণ। এই শৈবাল মানুষের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
ব্রিটানির বিখ্যাত ওয়েস্টার খামারগুলোতেও এই শৈবাল ছড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে হুমকিতে ফেলছে। স্থানীয় মানুষ এখন ক্লান্ত। চিকিৎসক পিয়েরে ফিলিপ বলেন, ‘আমি এই অঞ্চলকে ভালোবাসি, এটি চমৎকার। কিন্তু এই ধ্বংসলীলা আমার হৃদয় ভেঙে দেয়। ব্রিটানির নাইট্রেট দূষণের ৯০ শতাংশই আসে কৃষি খাত থেকে। সার এবং পশুবর্জ্য বৃষ্টিতে ধুয়ে জলাশয়ে মেশার ফলে শৈবালের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে, হাইড্রোজেন সালফাইড একটি অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। ১ পিপিএম মাত্রায় এটি অসহ্য গন্ধ ছড়ায়, কিন্তু ৫০০ পিপিএম মাত্রায় এটি মুহূর্তেই মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, উচ্চ মাত্রায় এই গ্যাস মানুষের ঘ্রাণশক্তিকে অবশ করে দেয়, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেও পারেন না যে তিনি বিষাক্ত গ্যাস নিচ্ছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান