কুইপু পদ্ধতিতে গিঁট দেওয়া রঙিন সুতা ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করা হতো
কুইপু পদ্ধতিতে গিঁট দেওয়া রঙিন সুতা ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করা হতো

৬০০ বছর আগের ইনকা সভ্যতায় মিলল কম্পিউটারের মতো সংখ্যা পদ্ধতি  

স্মার্টফোন বা আধুনিক বর্ণমালার উদ্ভবের অনেক আগেই ইনকা সভ্যতার মানুষ তথ্য ব্যবস্থাপনার এমন এক পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল, যা বর্তমান যুগের উন্নত প্রযুক্তির মতোই বিস্ময়কর। সে সময় কুইপু নামের এক পদ্ধতিতে গিঁট দেওয়া রঙিন সুতা ব্যবহার করে বিশাল সাম্রাজ্যের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে কুইপুকে কেবল গণনার হাতিয়ার মনে করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে এর পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, কুইপু কেবল গণনার যন্ত্র নয় বরং এটি তথ্য সাজানো এবং প্রসেস করার একটি কাঠামোগত পদ্ধতি। অনেকটা আদিম কম্পিউটিং সিস্টেমের মতো কাজ করত এই পদ্ধতি। কোনো লিখিত লিপি ছাড়াই একটি সভ্যতা কীভাবে আন্তআঞ্চলিক জটিল প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষণ করত।

বিজ্ঞানী মার্সিয়া অ্যাশার এবং রবার্ট অ্যাশারের তথ্য অনুযায়ী, কুইপু গিঁট সম্ভবত দশমিকভিত্তিক একটি সংখ্যা পদ্ধতি। প্রতিটি গিঁট এবং তার অবস্থান একটি নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। বিজ্ঞানী সাবিন হাইল্যান্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে জানিয়েছেন, কুইপুতে ভাষাগত উপাদানও কোড করা থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় ৯৫টি সম্ভাব্য চিহ্নের কথা বলা হয়েছে, যা শব্দ বা ধারণাকে উপস্থাপন করতে সক্ষম। এই কাঠামোর স্তরবিন্যাস আধুনিক তথ্যভান্ডারে ব্যবহৃত সিস্টেমের মতো, যেখানে তথ্যকে ক্যাটাগরি এবং সাব-ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। কুইপুকে তথ্য কাঠামো বা ইনফরমেশন ফ্রেমওয়ার্ক বলে মনে করা হচ্ছে।

কম্পিউটারবিজ্ঞানী রিচার্ড ডোসেলম্যান কুইপুকে আধুনিক ডেটা স্ট্রাকচারের লেন্স দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা এই পদ্ধতিকে ডিকোড করার বদলে একটি মডেল হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের ধারণাটি সহজ। তাঁরা মনে করছেন, কুইপু সুতা একটি মূল সুতা থেকে ডালপালার মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই শ্রেণিবিন্যাস বা হায়্যারার্কি বর্তমান কম্পিউটিংয়ে ব্যবহৃত ট্রি ডেটা সিস্টেমের হুবহু প্রতিচ্ছবি। গবেষকেরা এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে সি++ ও পাইথনের মতো প্রোগ্রামিং লজিকে রূপান্তর করেছেন। তাঁরা কুইপু নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি ফাইল ফরম্যাটও তৈরি করেছেন।

কুইপু লজিকের ওপর ভিত্তি করে কার্যকরী প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যার মধ্যে রয়েছে স্প্রেডশিট মডেল এবং ইমেজ রিপ্রেজেন্টেশন টুল। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পুরো কাঠামো পরিবর্তন না করেই নতুন তথ্য যোগ করা সম্ভব, যা আদমশুমারি বা ইনভেন্টরির মতো বড় ডেটাসেটের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কুইপুর অন্যতম অস্বাভাবিক দিক হলো এর নমনীয়তা। বিভিন্ন স্তরে সুতার বিন্যাস এলোমেলো করে দেওয়ার মাধ্যমে তথ্য সুরক্ষা বা ডেটা প্রোটেকশন নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি আধুনিক এনক্রিপশনের মতো আলাদা কোনো লেয়ার নয়। কাঠামোর ভেতরেই তথ্য গোপন করার মেকানিজম বিদ্যমান রয়েছে পুরোনো এই কাঠামোতে। ইনকারা হয়তো আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে ভাবেনি, কিন্তু তাদের পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যগুলো তা সমর্থন করে।

কুইপুকে কম্পিউটার বলাটা হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা মনে হতে পারে, কারণ এতে কোনো বিদ্যুৎ, প্রসেসর বা বাইনারি কোড নেই। তবুও তুলনাটি একেবারে অমূলক নয়। ইনকারা তথ্য জমা এবং ব্যবস্থাপনার একটি স্কেলেবল এবং অভিযোজনযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করেছিল, যা গ্রুপ করা বা সারসংক্ষেপ করার মতো আধুনিক সব ফিচার সমর্থন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কুইপুকে আক্ষরিক অর্থে কম্পিউটার না বলে একটি প্রাথমিক তথ্যপ্রযুক্তি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। শুধু হিসাব করার জন্য নয়, তথ্যকে সুসংগঠিত করার এক অনন্য মাধ্যম ছিল সেটি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া