শুনতে অনেকটা ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ সিনেমার গল্পের মতো মনে হতে পারে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, আমাদের মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আসলে সাতটি মাত্রার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা সাধারণত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়—এই চারটি মাত্রার অভিজ্ঞতা লাভ করি। কিন্তু বাস্তবতার গভীরে আরও তিনটি ভাঁজ করা স্তর বা মাত্রা লুকিয়ে আছে।
পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, রোমাঞ্চকর এই তত্ত্ব ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর মারা যাওয়ার পর আসলে কী ঘটে, তা–ই ব্যাখ্যা করছে। ১৯৭০–এর দশকে প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং উপলব্ধি করেছিলেন, ব্ল্যাক হোল থেকে বিকিরণ নির্গত হয়। একে হকিং রেডিয়েশন বলা হয়। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্ল্যাকহোলগুলো বাষ্পীভূত হয়ে মিলিয়ে যায়। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় মহাবিপত্তি। কোয়ান্টাম ফিজিকসের অন্যতম প্রধান নিয়ম হলো তথ্য কখনো ধ্বংস করা যায় না। যদি একটি ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে মহাবিশ্ব থেকে উধাও হয়ে যায়, তবে তার ভেতরে থাকা সব তথ্যও কি হারিয়ে যায়? যদি হারিয়ে যায়, তবে তা কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের পরিপন্থী। এই ৫০ বছরের পুরোনো বিতর্কের সমাধান দিয়েছেন স্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা। সমাধানের শর্ত একটাই মহাবিশ্বকে সাত মাত্রার হতে হবে।
আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকাশ বা স্পেস-টাইম হলো একটি চার মাত্রার চাদরের মতো। এটি অভিকর্ষ বলের প্রভাবে বাঁকতে পারে। কিন্তু আধুনিক তত্ত্ব বলছে, মহাকাশে আরও তিনটি গোপন মাত্রা আছে, যা আমরা সরাসরি দেখতে পাই না। স্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্সেসের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী রিচার্ড পিনকাক বলেন, ‘আমাদের মডেল প্রস্তাব করে, মহাবিশ্বের আসলে সাতটি মাত্রা রয়েছে। আমাদের জানা চারটির পাশাপাশি আরও তিনটি ক্ষুদ্র মাত্রা আছে। এসব এত শক্তভাবে পেঁচিয়ে আছে যে আমরা তাদের সরাসরি অনুভব করতে পারি না।’
বিজ্ঞানীদের মতে, যখন একটি ব্ল্যাকহোল বাষ্পীভূত হতে হতে ক্ষুদ্রতম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন এর ভেতরের এই সাত মাত্রা কার্যত একটি জটে পরিণত হয়। এই গোপন মাত্রার ভাঁজ হয়ে যাওয়া একটি বহির্মুখী শক্তি তৈরি করে, যাকে বলা হয় টরশন। এই শক্তি ব্ল্যাকহোলটিকে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে বাধা দেয়। এ প্রক্রিয়ার ফলে ব্ল্যাকহোলটি পুরোপুরি ভস্মীভূত না হয়ে একটি অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ হিসেবে টিকে থাকে। এটি একটি ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ১০ বিলিয়ন গুণ ছোট। এই ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশটিই ব্ল্যাকহোলের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া সব তথ্যের একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ বা মেমোরিয়াল হিসেবে কাজ করে। ফলে তথ্য কখনো ধ্বংস হয় না। এতে ইনফরমেশন প্যারাডক্সের সমাধান মেলে।
বিজ্ঞানীদের এই নতুন তত্ত্ব আরও কিছু বড় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের তথ্যানুযায়ী, ব্ল্যাকহোলের এই ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশগুলোই হতে পারে সেই রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার, যা মহাবিশ্বের ভরের ২৭ শতাংশ গঠন করে। তিনটি গোপন মাত্রা ও টরশন ফিল্ডের পারস্পরিক ক্রিয়াই সম্ভবত গড পার্টিকেল বা হিগস বোসন কণার সেই বৈশিষ্ট্য তৈরি করে, যা অন্য সব কণাকে ভর প্রদান করে।
যদি এই তত্ত্ব সঠিক হয়, তবে বিজ্ঞানীদের এমন কণা খুঁজে পাওয়ার কথা, যাতে অতিরিক্ত মাত্রার প্রভাব রয়েছে। এই কণা বর্তমান লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের ক্ষমতার চেয়ে কয়েক মিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী ও ভারী। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, বিগ ব্যাংয়ের অবশিষ্টাংশ হিসেবে রয়ে যাওয়া কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন অথবা মহাকাশের প্রাচীন ঢেউ গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সাত মাত্রার অস্তিত্বের প্রমাণ ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: ডেইলি মেইল