
ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। আর তাই রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের সঠিক তথ্য জানতে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, মহাবিশ্বের এই অধরা উপাদান আসলে অন্য কোনো মহাবিশ্ব থেকে আসা ব্ল্যাকহোল দিয়ে গঠিত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৭ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার। এটি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সিগুলোকে অনেকটা মহাকর্ষীয় আঠার মতো আটকে রাখে। অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন, এই অদ্ভুত উপাদান এমন কোনো অজানা কণা দিয়ে তৈরি, যা আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে না।
নতুন তত্ত্বের মতে, ডার্ক ম্যাটার বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের আগে অস্তিত্বশীল প্রাচীন কিছু ব্ল্যাকহোল হতে পারে। অন্য মহাবিশ্ব থেকে আসা এই অবশিষ্টাংশ ব্ল্যাকহোল আকারে ছোট হলেও প্রচণ্ড ভরসম্পন্ন এবং এগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য। কেবল তাদের মহাকর্ষীয় টানের মাধ্যমেই এদের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এনরিক গেজটানাগা বলেন, ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে ব্ল্যাকহোলগুলোই এখন প্রধান সন্দেহভাজন। আমাদের বর্তমান মহাবিশ্বের আগে অন্য একটি মহাবিশ্ব ছিল। বিগ ব্যাং ছিল মূলত সেই দুই মহাবিশ্বের মধ্যবর্তী একটি পরিবর্তন মাত্র। ডার্ক ম্যাটার কোনো নতুন কণা না–ও হতে পারে। এর পরিবর্তে এটি হতে পারে মহাবিশ্বের পূর্ববর্তী সংকোচন পর্ব এবং পুনরায় প্রসারণের ফলে তৈরি হওয়া ব্ল্যাকহোলের একটি সমষ্টি।
প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব একটি অসীম ঘন বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি থেকে শুরু হয়েছিল। এরপর একটি দ্রুত প্রসারণ পর্বের মাধ্যমে বর্তমান রূপ পেয়েছে। তবে অনেক বিজ্ঞানী সিঙ্গুলারিটির ধারণাটি পছন্দ করেন না। কারণ, অসীম ঘনত্বের ভেতরে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মগুলো ভেঙে পড়ে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী গেজটানাগা বলেন, আমরা হয়তো একটি বাউন্সিং মহাবিশ্বে বাস করছি। এই মতবাদ অনুযায়ী, মহাবিশ্ব তার পূর্ববর্তী পর্যায়ের শেষে নিজের ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে শুরু করেছিল। মহাবিশ্ব অত্যন্ত ঘন কিন্তু অসীম নয়, একটি বিন্দুতে পৌঁছানোর পর আবার লাফিয়ে বাইরের দিকে প্রসারিত হতে শুরু করে। এই প্রসারণ পর্বই হলো আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব। বিগ ব্যাং সবকিছুর পরম শুরু নয়। এটি পূর্ববর্তী সংকোচন পর্ব থেকে উত্তরণের একটি পর্যায়মাত্র। এটি আমরা যে প্রসারণ পর্যবেক্ষণ করছি, তার শুরু হতে পারে; কিন্তু সময়ের শুরু না–ও হতে পারে।
নতুন এই তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মহাবিশ্বের সেই সংকোচন বা ধ্বংসের সময় ব্ল্যাকহোলগুলো টিকে থাকতে পারে। আগের মহাবিশ্বের ছায়াপথ যখন সংকুচিত হচ্ছিল, তখন যে ব্ল্যাকহোলগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো আমাদের বর্তমান মহাবিশ্বে রয়ে গেছে। বিজ্ঞানী গেজটানাগার বলেন, এই রিলিক ব্ল্যাকহোল আজকের প্রসারণ পর্বেও টিকে থাকে এবং ঠিক ডার্ক ম্যাটারের মতোই আচরণ করে। তারা মহাকর্ষীয়ভাবে অন্য বস্তুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, কিন্তু কোনো আলো বিকিরণ করে না।
নতুন এই ধারণা বর্তমান বিজ্ঞানের কিছু কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীদের আর সিঙ্গুলারিটির অসীম ঘনত্বের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আবার ডার্ক ম্যাটার প্রমাণের জন্য কোনো রহস্যময় নতুন কণা খুঁজে পাওয়ারও প্রয়োজন পড়বে না। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের সুনির্দিষ্ট পরিমাপের মাধ্যমে এই তত্ত্ব পরীক্ষা করা হবে। যদি এটি প্রমাণিত হয়, তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম বড় দুটি ধাঁধার সমাধান হয়ে যাবে।
সূত্র: ডেইলি মেইল