আজ শনিবার আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস
আজ শনিবার আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস

আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস

বিড়ালের মগজের রহস্য

বিড়ালের চোখের নিমেষে আলমারির কোণে উঠে পড়া কিংবা দরজার খিল খোলার বুদ্ধি বিড়ালপ্রেমীদের কাছে এসব একেবারেই নতুন কিছু নয়। তবে এই চতুর খুদে প্রাণীর মাথার ভেতরে ঠিক কী ঘটে? বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিড়ালের বুদ্ধিমত্তা কেবল কয়েকটি কায়দা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তাদের সমস্যা সমাধান, নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ও মেধার বিকাশ ঘটানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা। গঠনগত দিক থেকে একটি বিড়ালের মস্তিষ্ক মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে আশ্চর্যজনক কিছু মিল বহন করে। তাদের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সে প্রায় ২৫ কোটি নিউরন থাকে। এই অংশ মূলত যেকোনো জটিল চিন্তা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য। শুধু তা–ই নয়, বিড়ালের মগজে রয়েছে নিউরোপ্লাস্টিসিটি স্নায়বিক নমনীয়তা। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা বা শেখার মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্ক নিজেই নিজের গঠন পুনর্গঠন করতে পারে।

মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুই সঙ্গী বিড়াল ও কুকুর। যুগে যুগে মানুষের বাসায় এরা জায়গা করে নিয়েছে নিঃশব্দে। বহুকাল ধরে ধারণা করা হতো কুকুর বেশি বুদ্ধিমান, আর বিড়াল একটু উদাসীন। তবে নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই পুরোনো ধারণাকে পুরো বদলে দিয়েছে। আধুনিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, বিড়ালের নীরব চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে চমৎকার বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ মেধা ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ক্ষমতা।

৮ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস পালন করা হয়। জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মনে করেন, স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় বিড়াল কুকুরের মতোই পারদর্শী। তারা মানুষের মতো জীবনের বিশেষ ঘটনার স্মৃতি বা এপিসোডিক মেমোরি মনে রাখতে সক্ষম। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী সাহো তাকেগি বলেন, বিড়াল ও কুকুর উভয়ই অতীতের একটি একক অভিজ্ঞতার স্মৃতি ব্যবহার করে। এটি নির্দেশ করে যে বিড়ালেরও মানুষের মতো চেতনা বা মেমোরি রয়েছে। বিড়াল যে কুকুরের চেয়ে কম বুদ্ধিমান, সাধারণ মানুষের এই ধারণার বিপরীতে বিড়ালও কুকুরের মতো বুদ্ধিমান হতে পারে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরি সান্তোস বলেন, বিড়াল কোথায় খাবার পেয়েছিল বা কোথায় আগে খুঁজেছিল, সেই তথ্য তারা চমৎকার মনে রাখতে পারে।

মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী বিড়াল

গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের মধ্যে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যা তাদের অনেক মানুষের ভাবনার চেয়ে বেশি চতুর প্রমাণ করে। বিড়ালদের স্মৃতিশক্তি বেশ প্রখর। জীবনের ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে তারা শেখে। তারা মনে রাখে, ঘরের কোথায় স্ন্যাকস বা পছন্দের খেলনা লুকানো আছে। এ ছাড়া নাম ধরে ডাকলে সব সময় সাড়া না দিলেও বিড়াল তার মালিকের কণ্ঠস্বর স্পষ্টভাবে চিনতে পারে। তবে প্রতিক্রিয়া জানানো বা না জানানো সম্পূর্ণ তার নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। নিজেদের বন্য পূর্বপুরুষদের মতো বিড়ালও দারুণ সমস্যা সমাধানকারী। তারা স্বাধীনভাবে ক্যাবিনেটের দরজা খোলা বা পছন্দের জায়গায় পৌঁছানোর উপায় নিজে নিজেই বের করে।

বিড়াল চারপাশের মানুষকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। তারা স্ন্যাকসের প্যাকেট খোলার শব্দ চেনে এবং বাসার দৈনন্দিন নিয়মকানুন খুব দ্রুত শিখে ফেলে। কোনো খেলনা বা পাখিকে লক্ষ্য করার সময় বিড়াল সময়, দূরত্ব ও গতি হিসাব করে। এই মানসিক সমন্বয় তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। এককভাবে জীবনযাপন করা বন্য প্রাণীর বংশধর হলেও হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে থাকার কারণে বিড়াল মানুষের সঙ্গে গভীর আবেগপ্রবণ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানী সাহো তাকেগির মতে, বিড়ালকে গভীরভাবে বুঝতে পারলে মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্কের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।

বিড়ালের মস্তিষ্কের এই বিকাশ নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার বেশির ভাগই গৃহপালিত বিড়ালকে কেন্দ্র করে। ইট–কাঠের শহুরে পরিবেশে মানিয়ে নিতে গিয়ে তাদের নানা জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আর এসব দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই মূলত এদের মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। এ ছাড়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রজনন ও জেনেটিক পরিবর্তনও তাদের মস্তিষ্কের এই বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। ছোটবেলায় একটি বিড়ালছানা কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, তার মূল কৌশলগুলো শেখে নিজের মাকে পর্যবেক্ষণ করে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালগুলো নিজের ভুল ও চেষ্টার মধ্য দিয়ে তাদের কাজ ও বুদ্ধিমত্তাকে আরও শানিয়ে নেয়।

সূত্র: বিবিসি নিউজ