একই গাছে একাধিক ধরনের ফল হওয়ার ছবি দেখলে প্রথমে মনে হতেই পারে, ছবিটি হয়তো এআই দিয়ে তৈরি বা ফটোশপে এডিট করা হয়েছে। শুনতে অবাক লাগলেও ৪০ ধরনের ফল ধরা গাছের অস্তিত্ব কিন্তু পৃথিবীতে সত্যিই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্যাম ভ্যান একেনের গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতির মাধ্যমে তৈরি করা গাছে ৪০ ধরনের ফল হয়ে থাকে। বসন্তের সময় সেই গাছে ডজনখানেক রঙের ফুল ফোটে। কয়েক মাস পর দেখা যায়, গাছটির বিভিন্ন ডালে থরে থরে ঝুলছে পিচ, পাম, চেরি ও অ্যাপ্রিকটের মতো হরেক রকমের ফল।
স্যাম ভ্যান একেন মূলত একজন ভাস্কর। তবে পাথর বা ব্রোঞ্জের মতো নির্জীব উপাদানের বদলে তিনি কাজ করতে পছন্দ করেন জীবন্ত উদ্ভিদ নিয়ে। তাঁর কাছে একটি গাছ কেবল প্রকৃতি নয়, বরং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হওয়া একটি জীবন্ত শিল্পকর্ম। জটিল পরিবেশগত সমস্যাকে জনসাধারণের কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করাই ভ্যান একেনের মূল লক্ষ্য। তাঁর এই ৪০ ফলের গাছ কেবল একটি সাধারণ গাছ নয়। তিনি এই গাছকে খাদ্য, শিল্প ও পরিবেশ সংরক্ষণের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হিসেবে প্রদর্শন করছেন।
একই গাছে ৪০ ধরনের ফল ধরার বিষয়টিকে সম্ভব করা হয়েছে গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতির মাধ্যমে। এই কৌশল হাজার হাজার বছর ধরে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভ্যান একেন চিপ গ্রাফটিং নামক একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতিতে একটি ফলন্ত গাছের ডাল থেকে একটি কুঁড়ি নিয়ে অন্য একটি ধারক গাছের ডালে স্থাপন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাল দুটির টিস্যু একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। তখন নতুন ডালটি মূল গাছের অংশ হিসেবে বেড়ে ওঠে ও ফল দেয়। তবে এই বৈচিত্র্যের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। এই গাছের সব ফলই প্রুনাস গণের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে পিচ, পাম, চেরি, অ্যাপ্রিকট ও আলমন্ড। যেহেতু এই সব প্রজাতি একে অপরের সঙ্গে জিনগতভাবে সম্পর্কিত, তাই তাদের সংবহনতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। এ কারণেই একই গাছে আপেল ও কমলা ফলের সংমিশ্রণ ঘটানো সম্ভব নয়।
এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। তবে একটি ৪০ ফলের গাছ এক দিনে তৈরি হয়নি। প্রতিটি গাছ সম্পূর্ণ হতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে। দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক ডাল নির্বাচন, গ্রাফটিং ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর ২০১৩-১৪ সালের দিকে প্রথম গাছটি পূর্ণতা পায় এবং ৪০ রকমের ফল দিতে শুরু করে।
২০০৮ সালে নিউইয়র্কের একটি কৃষি গবেষণা বাগান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে সেটি কিনে নেন ভ্যান একেন। সেখানে অনেক দুর্লভ প্রজাতির ফলের গাছ ছিল, তা বাণিজ্যিক কৃষিতে গুরুত্ব না পাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। সেই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে ভ্যান একেন তা একটিমাত্র গাছে একত্র করার সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া