চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি অংশ
চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি অংশ

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার ৪০ বছর পরও তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ

চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার প্রায় চার দশক পরও সেখানকার তেজস্ক্রিয়তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন লাইবনিজ ইউনিভার্সিটি হ্যানোভার ও হেলমহোল্টজ-জেন্ট্রাম ড্রেসডেন-রসেনডর্ফের একদল গবেষক। সম্প্রতি জার্নাল অব হ্যাজার্ডস মেটেরিয়ালস প্রকাশিত এক গবেষণা ফলাফলে গবেষকেরা জানিয়েছেন, চুল্লি থেকে বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়া পারমাণবিক জ্বালানির টুকরাগুলো ৪০ বছরেও প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা করত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

বর্তমানের ইউক্রেনের অংশ চেরনোবিলের চুল্লি থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পারমাণবিক জ্বালানির টুকরোগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে ভেঙে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। গবেষকদের তথ্যমতে, চেরনোবিলের জ্বালানিকণাগুলো পরিবেশের মধ্যে ফিশন পণ্য ও অ্যাক্টিনাইডের স্থায়ী ভান্ডার হিসেবে কাজ করছে। প্রায় চার দশক ধরে সংরক্ষিত এসব কণার অভ্যন্তরীণ কাঠামো প্রমাণ করে যে এগুলো সুদূর ভবিষ্যতেও তেজস্ক্রিয়তার স্থায়ী উৎস হিসেবে কার্যকর থাকবে।

চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার পর বায়ুমণ্ডলে শতাধিক ধরনের তেজস্ক্রিয় কণা ছড়িয়ে পড়েছিল। মাত্র ৮ থেকে ৫০ মাইক্রোমিটার আকৃতির সেই সব ক্ষুদ্র কণায় আজও তেজস্ক্রিয়তা থাকায় উত্তর ইউক্রেনের চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোন বা বর্জন অঞ্চলের মাটি ও আশপাশের পরিবেশকে দূষিত করে চলেছে। এ বিষয়ে গবেষক টোবিয়াস ওয়েসেনবার্ন বলেন, এসব কণাকে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে এমন কণা যেগুলোর সঙ্গে ইউরেনিয়াম ডাই–অক্সাইডের মতো পারমাণবিক জ্বালানির মিল রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির কণাগুলো জিরকোনিয়াম স্তরের মাধ্যমে আবৃত বা সংযুক্ত থাকে। তৃতীয় শ্রেণির কণা তৈরি হয়েছিল যখন চুল্লির গ্রাফাইট মডারেটরে আগুন ধরে যায় এবং তা ১০ দিন ধরে জ্বলতে থাকে। এ অগ্নিকাণ্ডের সময় জ্বালানি বিভিন্ন ইউরেনিয়াম অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়, যা সহজেই বাতাসে ভেসে বেড়ানোর মতো মাইক্রোস্কোপিক ধূলিকণায় পরিণত হতে পারে। এ ধরনের ধূলিকণা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

উন্নত এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচালিত এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো তেজস্ক্রিয় কণাগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা। দেখা গেছে, চার দশক ধরে উন্মুক্ত পরিবেশে থাকার পরও কিছু কণা তাদের আসল জ্বালানিকাঠামোর বেশির ভাগ অংশ অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে। টোবিয়াস ওয়েসেনবার্ন জানিয়েছেন যে প্রতিটি কণার গঠন আলাদা এবং গবেষণায় কেবল দুটি ভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ছয়টি কণা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। আর তাই কণাগুলোর স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সর্বজনীন ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে একাধিক স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, দুর্ঘটনার পর চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে ১ হাজার ৬০০ বর্গমাইল এলাকাকে এক্সক্লুশন জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। মানুষের বসতি নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এ বর্জন অঞ্চলে নেকড়ে, লিন্ডস, বন্য শূকর ও হরিণের মতো নানা ধরনের বন্য প্রাণী অবাধ ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বংশবৃদ্ধি করছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে এ অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে নতুন এ গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করে যে চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বজায় রাখবে।

সূত্র: ডেইলি মেইল