উৎক্ষেপণ মঞ্চে রকেট
উৎক্ষেপণ মঞ্চে রকেট

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রকেট উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে স্পেসএক্স

মহাকাশবিজ্ঞানে নতুন এক ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে ইতিহাসের সবচেয়ে উঁচু ও শক্তিশালী রকেট উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে স্পেসএক্স। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের তৈরি স্টারশিপ রকেটের একটি ব্যাপক উন্নত সংস্করণ মহাকাশে পাঠাবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১৯ মে এই ঐতিহাসিক উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত স্পেসএক্সের স্টারবেজ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে রকেটটি ওড়ানো হবে।

এই অভিযানের দিকে কড়া নজর রাখছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২০২৮ সালের মধ্যে আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর যে পরিকল্পনা নাসা হাতে নিয়েছে, তা অনেকটাই এই স্টারশিপ রকেটের সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। স্টারশিপ রকেটের মূলত দুটি অংশ রয়েছে। এর ওপরের অংশটিকে বলা হয় স্টারশিপ। আর নিচের অংশটির নাম সুপার হেভি। এবারের অভিযানে দুই অংশেরই সম্পূর্ণ নতুন সংস্করণ ভার্সন ৩ ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুরো রকেটটির মোট উচ্চতা হবে ১২৪ মিটার। এটি স্পেসএক্সের আগের সংস্করণের চেয়ে প্রায় ১ মিটার বেশি উঁচু। এই উচ্চতা নাসার বর্তমান স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি ১৯৬০ ও ৭০–এর দশকে চাঁদে নভোচারী পাঠানো বিখ্যাত স্যাটার্ন ৫ রকেটের (১১১ মিটার) উচ্চতাকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে। স্যাটার্ন ৫ রকেটের উচ্চতা ছিল ১১১ মিটার।

রকেটটির শক্তিও বিস্ময়কর। উৎক্ষেপণের সময় এটি ৭৫ হাজার কিলোনিউটন ধাক্কা তৈরি করতে পারবে। এটি নাসার এসএলএস রকেটের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী। যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যালিস্টারের হিসাব অনুযায়ী, এই রকেটের সব ইঞ্জিন যখন পূর্ণ শক্তিতে চালু হবে, তখন তা জার্মানির পুরো দেশের উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের চেয়ে বেশি শক্তি তৈরি করবে।

গত বছরের অক্টোবরে স্টারশিপের একাদশ পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। এর পর থেকে রকেটের নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে স্পেসএক্স। এবারের দ্বাদশ পরীক্ষায় রকেটের দুই অংশেই র‍্যাপ্টর ভার্সন ৩ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে। রকেটের সুপার হেভি অংশে গ্রিড ফিনের সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে তিন করা হয়েছে। তবে এগুলোর আকার প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এই ফিনগুলো রকেটটিকে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আবার পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে স্টারশিপ অংশে বড় জ্বালানি ট্যাংক, কক্ষপথে জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি ও বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় উত্তাপ প্রতিরোধী উন্নত টাইলস যুক্ত করা হয়েছে।

স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের মূল লক্ষ্য হলো এই রকেটের মাধ্যমে একদিন মঙ্গলে মানুষ পাঠানো। তবে আপাতত নাসার আর্টেমিস চন্দ্রাভিযানের জন্য এটি একটি বড় ভরসা। নাসা চাঁদে মানুষ নামানোর জন্য স্পেসএক্সের এই স্টারশিপ ও জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের দুটি প্রতিষ্ঠানের ল্যান্ডার নির্বাচন করেছে। নাসার একটি সাম্প্রতিক নথি থেকে জানা গেছে, ২০২৮ সালের আর্টেমিস–৪ অভিযানে নভোচারীরা প্রথমে নাসার এসএলএস রকেটে চড়ে মহাকাশে যাবেন। পরে সেখানে স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁরা চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেন।

স্পেসএক্স মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কৌশল অনুসরণ করছে। একে বলা হয় দ্রুত ব্যর্থ হও, দ্রুত শেখো। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি বিশ্বে এই কৌশল খুব জনপ্রিয়। এর আগের ১১টি পরীক্ষার মধ্যে ছয়টি সফল ও পাঁচটি ব্যর্থ হয়েছে। লন্ডনের কিংস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষক পিটার শ বলেন, রকেটবিজ্ঞান অত্যন্ত জটিল। এখানে ব্যর্থতা আসবেই। তবে স্পেসএক্স প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়। আরও কয়েকবার ব্যর্থ হলেও তারা নতুনভাবে সিস্টেম তৈরি করবে এবং সফল হবে। এবারের পরীক্ষাটি প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক নমুনা নয়। এটি মূলত চূড়ান্ত উৎপাদন মডেলের প্রথম পরীক্ষা। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল প্রযুক্তিকে নির্ভরযোগ্য করে তোলা।

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট