আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে থাকা তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ব্যারেল
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে থাকা তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ব্যারেল

আটলান্টিকের তলদেশে ছড়িয়ে পড়ছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসারের সময় বিভিন্ন দেশের কাছে জমা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। সমস্যা সমাধানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তখন আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ব্যারেলে ভরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলেছিল। দীর্ঘদিন পর সেই ডুবন্ত বর্জ্যের ব্যারেলগুলো পরীক্ষা করে ভয়ংকর তথ্য জানতে পেরেছেন গবেষকেরা। গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় ব্যারেলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেতরে থাকা বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো মহাসাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

১৯৪৯ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রায় দুই লাখের বেশি তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ব্যারেল আটলান্টিক মহাসাগরের তিন থেকে পাঁচ হাজার মিটার গভীরে ফেলা হয়েছিল। মোট দেড় লাখ টনেরও বেশি ওজনের এই বর্জ্যের মধ্যে সিজিয়াম-১৩৭ এবং প্লুটোনিয়ামের মতো বিপজ্জনক উপাদান রয়েছে, যা হাজার হাজার বছর ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের পারমাণবিক প্রকৌশলী প্যাট্রিক চার্ডন এবং সামুদ্রিক ভূতাত্ত্বিক জাভিয়ের এসকার্টিন এই বর্জ্যের বর্তমান অবস্থা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। তাঁদের নেতৃত্বে একদল গবেষক আটলান্টিকের তলদেশে অনুসন্ধান চালান।

গবেষকেরা প্রথমে ইউলিক্স নামক একটি স্বয়ংক্রিয় ডুবোযানের সাহায্যে এক মাসে তিন হাজার ৩৫৫টি ব্যারেলের অবস্থান চিহ্নিত করেন। এরপর গত মে মাসে গবেষকেরা নটিলে নামের তিন সদস্যের সাবমারসিবলে চেপে প্রায় চার হাজার ৭০০ মিটার গভীরে গিয়ে ব্যারেলগুলো সরাসরি পরীক্ষা করেন। সাবমারসিবলের সংগৃহীত ছবি ও নমুনায় দেখা যায়, ব্যারেলগুলোর কিছু অংশ ক্ষয়ে ভেতরের বর্জ্য পদার্থগুলো বালুর ওপর গলে পড়ছে। তবে অবাক করার বিষয় হলো এই ব্যারেলগুলো সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য একধরনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অ্যানিমোন, স্পঞ্জ, সি কিউকাম্বার এবং বিশেষ করে কাঁকড়ারা এই ব্যারেলগুলোর চারপাশে বসবাস শুরু করেছে।

গবেষকেরা ব্যারেলের আশপাশের পানি পরীক্ষা করে কোবাল্ট-৬০ এবং নিওবিয়াম-৫৪ এর মতো উল্লেখযোগ্য তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। তবে তেজস্ক্রিয় উপাদানগুলো আশপাশের এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে না। সংগৃহীত নমুনাগুলো বর্তমানে গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যাতে বোঝা যায় এই তেজস্ক্রিয়তা সামুদ্রিক প্রাণীদের দেহে প্রবেশ করছে কি না।

পারমাণবিক বর্জ্যগুলোর সঠিক মানচিত্র ও নমুনা সংগ্রহ করে গবেষকেরা এখন গভীর সমুদ্রের পরিবেশের ওপর এর প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। মানবসৃষ্ট এই পারমাণবিক বর্জ্য সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা এই গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট