মহাবিশ্বের দূরবর্তী গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা ছায়াপথ স্তবকগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্যার আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের কঠিন এক পরীক্ষা করেছেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। গবেষণায় দেখা গেছে, নিউটন সপ্তদশ শতাব্দীতে মহাকর্ষের যে সূত্র দিয়েছিলেন, তা আজও একইভাবে কার্যকর রয়েছে। ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা ফলাফলে বিজ্ঞানী প্যাট্রিসিও গ্যালার্দো বলেন, এটি সত্যিই বিস্ময়কর। সপ্তদশ শতাব্দীতে নিউটন যে বিপরীত বর্গীয় সূত্র প্রস্তাব করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তা একুশ শতকে এসেও অটল রয়েছে।
নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্র অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা অন্য প্রতিটি কণাকে তার ভরের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক বলে আকর্ষণ করে। দূরত্ব বাড়লে আকর্ষণ শক্তি বর্গের হারে কমে আসে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর ওপর এ প্রভাবের উপস্থিতি আমাদের মহাকর্ষসংক্রান্ত বর্তমান ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তুর অস্তিত্বের স্বপক্ষে জোরালো প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
আমরা যখন মহাবিশ্বের দিকে তাকাই, তখন একটি অদ্ভুত অসঙ্গতি চোখে পড়ে। আমাদের পরিচিত দৃশ্যমান মহাজাগতিক বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্রহ, কৃষ্ণগহ্বর, ধূলিকণা বা গ্যাসসহ সবকিছু পরিমাপের সময় দেখা যায় যে মহাবিশ্বের বস্তুগুলো যেভাবে চলার কথা ছিল, সেভাবে চলছে না। এ অসঙ্গতির মধ্যে দেখা যায় যে গ্যালাক্সিগুলো তাদের দৃশ্যমান ভরের তুলনায় অনেক দ্রুত ঘুরছে। মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আলো স্পেস-টাইম বা স্থান-কালের এমন বক্রতা অনুসরণ করছে যা কেবল দৃশ্যমান ভরের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এ সময় গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তবে সেগুলো অদৃশ্য কোনো শক্তির টানে একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে আছে। এ রহস্যের দুটি প্রধান ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো ডার্ক ম্যাটার। ডার্ক ম্যাটার এমন এক রহস্যময় বস্তু যা আমরা সরাসরি দেখতে না পেলেও মহাকর্ষের মাধ্যমে দৃশ্যমান জগতের ওপর প্রভাব ফেলে। বর্তমান পরিমাপ অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ বস্তুই হলো এই ডার্ক ম্যাটার। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হলো, নিউটন ও আইনস্টাইনের মহাকর্ষ সংজ্ঞায় হয়তো কোনো ভুল আছে। মনে করা হয় যে বিশাল দূরত্বে মহাকর্ষ সূত্রটি হয়তো আমাদের ধারণার চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে।
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞানী গ্যালার্দো ও তাঁর সহকর্মীরা ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা প্রায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গতিবেগ পরিমাপ করেছেন। মহাবিশ্বের প্রাচীনতম আলো যখন আমাদের দিকে আসে, তখন তা অনেক সময় গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের চারপাশের গরম গ্যাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদি ক্লাস্টারটি স্থির থাকে, তাহলে আলো সরলরেখায় চলে আসে। কিন্তু গ্যালাক্সি ক্লাস্টার যদি গতিশীল থাকে, তাহলে সেই আলো ইলেকট্রনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তার সংকেতে সামান্য পরিবর্তন ঘটায়। এ পরিবর্তনের মাত্রা মেপেই মূলত গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গতিবেগ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।
যদি মহাকর্ষ সূত্র ভুল হতো, তবে দেখা যেত যে বিশাল দূরত্বে মহাকর্ষীয় টান প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর মধ্যবর্তী আকর্ষণ শক্তি নিউটন ও আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ ফলাফল নির্দেশ করে, মহাকর্ষ সূত্রে পরিবর্তন আনার চেয়ে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি প্রবল। কারণ, মহাকর্ষের নিয়ম যদি ঠিক থাকে, তাহলে সেই বাড়তি টান অনুভব করার জন্য অবশ্যই মহাবিশ্বে অদৃশ্য কোনো ভর বা ডার্ক ম্যাটার রয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট