রহস্যময় অ্যান্টার্কটিকার মাইলের পর মাইল পুরু বরফের নিচে কী আছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি স্যাটেলাইটে ধারণ করা তথ্য ও আইস-ফ্লো মডেলিং ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো মহাদেশটির বরফের নিচে থাকা ৩০ হাজারের বেশি পাহাড় শনাক্ত করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের তৈরি অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে বিস্তারিত মানচিত্রে বরফের নিচে হাজার হাজার পাহাড়ের পাশাপাশি উপত্যকা ও গিরিখাতের অস্তিত্বও ধরা পড়েছে। বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, অ্যান্টার্কটিকার বরফে আবৃত বিভিন্ন পাহাড়ের উচ্চতা কমপক্ষে ১৬৫ ফুট বা তার বেশি। এই বিস্তারিত তথ্যের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কত দ্রুত বাড়বে, তা আগের চেয়ে নির্ভুলভাবে গণনা করা সম্ভব হবে।
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পুরো ইউরোপের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বড়। এত দিন ধারণা করা হতো, বরফের নিচে বিশাল সমতল ভূমি রয়েছে। কিন্তু নতুন মানচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের বিজ্ঞানী রবার্ট বিংহাম বলেন, অ্যান্টার্কটিকার লুকানো ভূপ্রকৃতি মোটেও একঘেয়ে নয়। এখানে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি থেকে শুরু করে বিশাল সমভূমির মতো সবই আছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা উত্তর কানাডার ভূপ্রকৃতির মতো গভীর গিরিখাতের মাধ্যমে বিভক্ত মালভূমিও এখানে বিদ্যমান।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, বরফের নিচের এই অমসৃণ ভূমি বা পাহাড় বরফ গলে সাগরে চলে যাওয়ার গতিকে ধীর করে দেয়। তাই বরফের নিচের মাটির গঠন জানা অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে—বরফ কত দ্রুত পিছলে সাগরে গিয়ে পড়বে এবং বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখবে। এত দিন বিজ্ঞানীরা রাডার ব্যবহার করে এই মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করতেন। এবারের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আইস-ফ্লো পার্টাব্রেশন অ্যানালাইসিস নামের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এ পদ্ধতিতে বরফের উপরিভাগের গতির ওপর ভিত্তি করে নিচের মাটির গঠন কেমন হবে, তা স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে বের করা হয়েছে।
বিজ্ঞানী হেলেন ওকেনডেন জানিয়েছেন, এই পদ্ধতি রোমাঞ্চকর। কারণ, এটি পুরো মহাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। এত দিন আমরা মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠের মানচিত্র যতটা ভালো জানতাম, তার চেয়ে কম জানতাম অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচের জগৎ সম্পর্কে। এই নতুন মানচিত্র সেই অভাব পূরণ করল। অ্যান্টার্কটিকা সব সময় বরফে ঢাকা ছিল না। প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে যখন এটি দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তখন থেকেই এর পাহাড় ও উপত্যকা তৈরি হতে শুরু করে। পরবর্তীকালে প্লেট টেকটোনিকসের কারণে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বরফের স্তরে ঢাকা পড়ে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস